২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যাত্রা শুরুর পর থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রতিটি আসরে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে ভারত ও শ্রীলংকার যৌথ আয়োজনে শুরু হওয়া টুর্নামেন্টের দশম আসরে এসে সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ল। দীর্ঘ ১৯ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অনুপস্থিতিতে মাঠে গড়াচ্ছে টি-টোয়েন্টির বৈশ্বিক আসর।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটের এই জনপ্রিয় ফরম্যাটে খেলাধুলার চেয়ে কূটনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণই যেন বড় হয়ে উঠেছে। মাঠের ব্যাট-বলের লড়াই অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে, সামনে চলে আসছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও প্রভাব বিস্তারের বাস্তবতা। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ আয়োজন সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে আয়োজন করা এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পেছনের প্রেক্ষাপট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে বহুল আলোচিত। আইপিএলে বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও সম্মানজনিত উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এ অবস্থায় ভারতে ম্যাচ খেলতে অনিচ্ছা জানিয়ে সব ম্যাচ শ্রীলংকায় আয়োজনের প্রস্তাব দেয় বিসিবি। তবে সেই অনুরোধ আমলে না নিয়ে আইসিসি বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা দেয়। এতে করে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হলে সম্প্রচার ও বিপণনে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।
বাংলাদেশের এই অবস্থান অনেকের চোখে ক্রিকেটীয় সাহসিকতার দৃষ্টান্ত। দেশের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন থাকার এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আইসিসির নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
যদিও মাঠে নেই বাংলাদেশ, তবুও বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন দেশের প্রতিনিধিরা। আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ ও গাজী সোহেল। ধারাভাষ্যকার হিসেবে থাকবেন আতহার আলী খান।
এদিকে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের হতাশা কিছুটা লাঘব করতে ঘরোয়া উদ্যোগ নিয়েছে বিসিবি। ‘অদম্য বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি কাপ’ নামে তিন দলের একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, যেখানে স্থানীয় ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স দেখানোর সুযোগ মিলছে।
২০ দলের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া এবারের বিশ্বকাপে প্রতিদিনই একাধিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। চার গ্রুপে ভাগ হয়ে দলগুলো লড়বে সুপার এইটে ওঠার জন্য। ভারত ও শ্রীলংকার বিভিন্ন স্টেডিয়ামে মোট ৫৫টি ম্যাচ আয়োজন করা হবে।
পাকিস্তান তাদের সব ম্যাচ খেলবে শ্রীলংকায়। তারা ফাইনালে উঠলে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে কলম্বোয়, অন্যথায় ফাইনালের ভেন্যু হবে আহমেদাবাদ। গ্রুপ পর্বে ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও নামিবিয়া একই গ্রুপে রয়েছে।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত নিজেদের মাঠে শিরোপা ধরে রাখার অন্যতম দাবিদার। পাশাপাশি ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তানকেও ফেভারিট ধরা হচ্ছে। তবে ইনজুরির কারণে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা দুর্বল অবস্থায় আছে।
এবারের আসরে নতুন সংযোজন ইতালি—ফুটবলের দেশ হলেও প্রথমবার ক্রিকেটের বৈশ্বিক মঞ্চে তাদের উপস্থিতি আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এই বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকবে এক ধরনের শূন্যতা ও আক্ষেপের প্রতীক হয়ে। মাঠে না থেকেও যে বাংলাদেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তা এই টুর্নামেন্টই সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে।





