জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর :
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহার, পরিকল্পিত নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত সহিংসতার এক অন্ধকার অধ্যায় আট বছর পর উঠে এসেছে বিচারিক কাঠগড়ায়। গ্রেফতারের পর আদালতে হাজির না করে সাজানো ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে গুলি চালিয়ে দুই ছাত্রনেতাকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগে সাবেক পুলিশ সুপার ও থানার ওসিসহ আটজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ আমলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
২০১৬ সালে যশোরের চৌগাছায় সংঘটিত ওই ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে চাপা পড়ে থাকলেও সম্প্রতি তদন্তে উঠে আসা ভয়াবহ তথ্য ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আমলে নেন। একই সঙ্গে পাঁচজন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং অপর তিনজনকে আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত নথি, সাক্ষ্য ও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট যশোরের চৌগাছা এলাকা থেকে রুহুল আমিন ও ইসরাফিল নামের দুই ছাত্রনেতাকে পুলিশ আটক করে। আটকের সময় তাদের বিরুদ্ধে কোনো বৈধ গ্রেফতারি পরোয়ানা কিংবা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল না। তবুও পুলিশ তাদের আটক দেখিয়ে থানায় নিয়ে যায় এবং আইন অনুযায়ী আদালতে হাজির না করে টানা দুই রাত হেফাজতে রাখে।
এই দুই রাতেই শুরু হয় ভয়াবহ নির্যাতন। তদন্তে উঠে এসেছে, শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক চাপ সৃষ্টি করে তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত স্বীকারোক্তি না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর মোড় নেয়। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, তখন ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে একটি সাজানো ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ঘটনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যার মাধ্যমে আটক দুজনকে গুরুতরভাবে জখম করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন যশোর জেলা পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানের নির্দেশে অধীনস্থ কর্মকর্তারা এই পরিকল্পনা কার্যকর করেন। একপর্যায়ে রুহুল আমিন ও ইসরাফিলের পায়ে গুলি চালানো হয় এবং ঘটনাটিকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি নির্যাতন। প্রসিকিউশনের ভাষ্যমতে, গুলিবিদ্ধ ক্ষতস্থানে ইচ্ছাকৃতভাবে বালু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ক্ষত দ্রুত সংক্রমিত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও স্থায়ী ক্ষতির সৃষ্টি করে।
এরপর গামছা দিয়ে শক্ত করে ক্ষতস্থান বেঁধে তাদের একটি সাজানো অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় এবং আদালতে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসা নথি ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ক্ষতস্থানে বালু ঢোকানোর কারণে তাদের পায়ে মারাত্মক সংক্রমণ ও পচন ধরে। যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় দুজনের শারীরিক অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে জীবন রক্ষার শেষ উপায় হিসেবে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে রুহুল আমিন ও ইসরাফিল—উভয়েরই একটি করে পা কেটে ফেলতে হয়। এই স্থায়ী পঙ্গুত্ব তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎকে চিরতরে বিপর্যস্ত করে দেয়। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই ক্ষতি ছিল অনিবার্য নয়, বরং পরিকল্পিত নির্যাতনের সরাসরি ফল।
এদিকে যে অস্ত্র মামলার ভিত্তিতে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছিল, সেই মামলার তদন্ত শেষে প্রমাণিত হয় এটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো। অস্ত্র উদ্ধারের বর্ণনা, ঘটনাস্থল এবং পুলিশি বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এই তথ্যই পরবর্তীতে ঘটনাটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তি তৈরি করে।
এই মামলায় ইতোমধ্যে চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হক গ্রেফতার হয়েছেন। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, তারা সরাসরি গুলি চালানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন। অভিযোগ আমলে নেওয়া অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান এবং এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল ও এসআই মাজেদুল। তাদের সবার বিরুদ্ধেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের যুক্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে এই ধরনের পরিকল্পিত নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত সহিংসতা এবং স্থায়ী পঙ্গুত্ব সৃষ্টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। সে কারণেই মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারে আনা হয়েছে।
দীর্ঘ আট বছর পর এই মামলার বিচারিক অগ্রগতিকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে আইন ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, এই বিচার প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারবহির্ভূত সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।





