রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও শাসনব্যবস্থার চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা ক্ষুণ্ন হলে রাষ্ট্রের ভিত শক্তিশালী হয় না, বরং দুর্বল হয়ে পড়ে। সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা: গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সংলাপে বক্তারা এসব অভিমত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এনামুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আগামী দিনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের জন্য আরও জটিল রূপ নিতে পারে। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশের এফআইআর সংক্রান্ত বিদ্যমান বিতর্কিত ও সমস্যাসংকুল চর্চা বন্ধ করার ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। ড. এম. এনামুল হক আরও বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে বিচার বিভাগ, দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং পরিবহন খাতসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
এই সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন সাবেক আইজিপি ড. এম. এনামুল হক, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন, সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারওয়ার মিলন, গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জাসদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মোশতাক হোসেন, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, নৈতিক সমাজ বাংলাদেশের সংগঠক মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনিরুল ইসলাম আকন্দ, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আলী আকবরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও আইনজীবীরা।
বিএনপি নেতা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র যদি এই ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক কাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। তিনি বলেন, নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণা বর্তমান বাস্তবতায় আর যথেষ্ট নয়; এখন এটি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভেনেজুয়েলা, পানামা ও চিলির উদাহরণ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রভাব ও বহিরাগত হুমকিও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকেও নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন, আসন্ন নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সামনে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি হবে। সেই বাস্তবতায় পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো সংস্কার করা ছাড়া বিকল্প নেই। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক জ্ঞান, দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজন ও সাধারণ জনগণের ঐক্য অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তবে এটি বাস্তবায়নে জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তিনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নাগরিক জবাবদিহি বাড়ায় এবং স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রধান ভিত্তি।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার জনতার চাপ ও মব রাজনীতির কাছে আপস করছে। জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ ও প্রশাসনকে পুনর্গঠনের পরিবর্তে তাদের একতরফাভাবে দায়ী করার ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে। এসব বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। সীমান্ত নিরাপত্তা সংকটের পেছনে পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা উচিত।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ বলেন, চলমান নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সঠিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায় না। তার মতে, নির্বাচনটি পক্ষপাতদুষ্টভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি জনগণের প্রকৃত ইচ্ছা বা কল্যাণের প্রতিফলন নয়। যথাযথ সংস্কার ও ব্যবস্থা না নিলে দেশ গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যাবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা একে অপরের পরিপূরক এবং উভয়ই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা না গেলে জনআস্থা আরও কমে যাবে এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।





