বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চালের উৎপাদনে ঘাটতি নেই, তবু দাম বেশি কেন—ব্যাখ্যা সিপিডির

আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও দেশের বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়ছে না—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, বৈশ্বিক বাজারে চালের মূল্য প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেলেও দেশে দাম অপরিবর্তিত থাকার পেছনে প্রধানত উৎপাদন ব্যয় ও বাজারে ব্যবসায়ীদের সংগঠিত নিয়ন্ত্রণ বড় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে দেশে চাল উৎপাদনে ঘাটতি না থাকলেও ভোক্তারা এর সুফল পাচ্ছেন না।

শনিবার ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৫–২৬: নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেমও উপস্থিত ছিলেন।

ব্রিফিংয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৩ সাল থেকে দেশে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি শুরু হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সেই গতি খুবই ধীর এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্য বহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে রয়ে গেছে। ফলে খাদ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি আরও বলেন, চালের বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে বার্ষিক চালের চাহিদা প্রায় ৩১ মিলিয়ন মেট্রিক টন, অথচ উৎপাদন রয়েছে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ সরবরাহে ঘাটতি নেই। তারপরও চালের দাম বাড়তির দিকে। সিপিডির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। একই চিত্র চিনি ও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন নেই।

আসন্ন নির্বাচন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরতার প্রেক্ষাপটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, তবে তা নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, নভেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাকি সময়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বর্তমান বাস্তবতায় অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। এর মধ্যেই সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে, যা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে সিপিডি।

সরকারি ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে সরকারি ব্যয় বাস্তবায়নের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র সাড়ে ১১ শতাংশ। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, নৌপরিবহন, রেলপথ ও স্বাস্থ্য খাতসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে বাস্তবায়ন হার অত্যন্ত কম। এর ফলে বাজেট ঘাটতির পরিবর্তে সাময়িক উদ্বৃত্ত দেখা গেলেও তা মূলত উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতির ফল। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাজেটে অনুদান বাদে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

অন্যদিকে সরকারের অর্থায়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমলেও ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে সরকার ব্যাংক খাতকে অর্থ ফেরত দিয়েছিল। অব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে নেতিবাচক অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাওয়ায় এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

সিপিডির মতে, ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের বাড়তি নির্ভরতা ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এবং সুদের হারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি দুর্বল পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করতে সরকারকে ২০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধে আরও ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন, যা না দিলে আগামী গ্রীষ্মে লোডশেডিং পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। এর সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

সুপারিশে সিপিডি বলেছে, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে ডিজিটাল অর্থনীতি, সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর কার্যকর কর ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বাস্তব বাজারদরের ভিত্তিতে সম্পত্তি কর হালনাগাদ করে তা এনবিআরের সম্পদ কর কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় ও অব্যাহতিগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করে বাতিল করতে হবে এবং খামখেয়ালি কর সুবিধা প্রদানের সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ অর্থপ্রবাহ রোধে নীতিগত উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তব প্রয়োগেও কর কর্তৃপক্ষকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শেয়ার করুন