বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দাসদের থালায় থেকে রাজকীয় ভোজ পর্যন্ত রসুনের বিশ্বজয়

মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসে রসুন একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শুধু স্বাদ বাড়ানোর জন্য নয়, বরং নানা ধরনের স্বাস্থ্যগুণের কারণেও হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জীবাণুনাশক ও ভাইরাস প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের জন্য রসুন বহু সংস্কৃতিতে খাবারের পাশাপাশি প্রথাগত চিকিৎসাতেও জায়গা করে নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রসুনের উৎপত্তিস্থল এশিয়া মহাদেশ হলেও মানুষের অভিবাসন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বিশ্বের মোট রসুন উৎপাদনের বড় অংশ আসে চীন থেকে। রসুনের দীর্ঘ ইতিহাস, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং মানবস্বাস্থ্যে এর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে সম্প্রতি গবেষণা ও আলোচনা করেছে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ‘ফুড চেইন’ অনুষ্ঠান।

রান্নাঘরের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ

বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের রান্নায় রসুন এখন অপরিহার্য একটি উপাদান। ফ্রান্সে অবস্থিত একটি ফরাসি রান্না প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রশিক্ষক ড্যানিশ শেফ পল এরিক জেনসেন জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন কাউকে তিনি দেখেননি, যে রসুনের সঙ্গে পরিচিত নয়।

ফরাসি রান্নায় রসুনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ঝাল বা নোনতা খাবারে রসুন ছাড়া স্বাদ কল্পনাই করা যায় না। স্যুপ, সবজি কিংবা মাংসের যেকোনো পদেই রসুন কোনো না কোনোভাবে ব্যবহৃত হয়। তার মতে, রসুন ছাড়া ফরাসি রান্নার অস্তিত্ব প্রায় অসম্ভব।

তবে বিষয়টি সবসময় এমন ছিল না। ১৯৭০-এর দশকে ডেনমার্কের গ্রামাঞ্চলে বড় হওয়া জেনসেনের শৈশবে রসুন খুব একটা জনপ্রিয় ছিল না। তীব্র গন্ধের কারণে অনেকেই তখন রসুনকে এড়িয়ে চলতেন। পরে তুর্কি অভিবাসীদের আগমন এবং ইতালিয়ান খাবারের জনপ্রিয়তার মাধ্যমে ডেনমার্কে রসুনের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে।

বর্তমানে শেফ জেনসেন নিজেই রসুনকে প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে বিশ্বাস করেন। তিনি জানান, প্রতিদিন সকালে স্যুপের সঙ্গে কাঁচা রসুন খাওয়ার অভ্যাসের কারণে তিনি ও তার সঙ্গী দীর্ঘদিন ধরে সর্দি-কাশি বা ফ্লুতে ভুগছেন না।

সাধারণ মানুষের খাদ্য থেকে রাজকীয় টেবিলে

রসুনের ইতিহাস শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা সংস্কৃতি ও বিশ্বাস। প্রাচীন গ্রিসে জাদু ও গৃহরক্ষার দেবীর উদ্দেশ্যে চৌরাস্তার মোড়ে রসুন উৎসর্গ করার রীতি ছিল। মিশরের ফারাও তুতেনখামুনের সমাধিতেও রসুনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা পরকালে তাকে রক্ষা করবে বলে বিশ্বাস করা হতো।

চীন ও ফিলিপাইনের লোককাহিনীতে রসুনকে অশুভ শক্তি ও রক্তচোষা প্রাণী তাড়ানোর উপকরণ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

‘গার্লিক: অ্যান এডিবল বায়োগ্রাফি’ গ্রন্থের লেখক রবিন চেরি জানান, পৃথিবীর প্রাচীনতম রেসিপিগুলোর একটি প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের মেসোপটেমীয় এক ধরনের স্ট্যু তাতে রসুন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসেও রসুনের গুরুত্ব স্পষ্ট। প্রাচীন মিশরের ‘এবার্স প্যাপিরাস’-এ বিভিন্ন রোগ, পরজীবী সংক্রমণ, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টে রসুন ব্যবহারের নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে। গ্রিক চিকিৎসাবিদ হিপোক্রেটিসসহ অ্যারিস্টটল ও অ্যারিস্টোফেনিসের লেখাতেও রসুনের ঔষধি গুণের কথা উঠে এসেছে।

তবে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে রসুনকে ‘নিম্নবিত্তের খাবার’ হিসেবেই দেখা হতো। দাস, নাবিক ও শ্রমজীবী মানুষের শক্তি বাড়ানোর জন্য এটি ব্যবহার করা হতো, কারণ এটি সস্তা এবং নিম্নমানের খাবারের গন্ধ ঢাকতে সক্ষম ছিল।

পরবর্তীতে ইউরোপের রেনেসাঁ যুগে রসুনের সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তিত হতে শুরু করে। ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ হেনরির রসুনপ্রিয়তা এবং উনবিংশ শতকে ইংল্যান্ডে এর জনপ্রিয়তা বাড়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে রসুন অভিজাত শ্রেণিতেও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের মাধ্যমে বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রসুন জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং এর বিরুদ্ধে থাকা নেতিবাচক ধারণাও কমতে থাকে।

স্বাস্থ্যগুণ ও আধুনিক গবেষণা

বর্তমানে বিশ্বে ৬০০টিরও বেশি প্রজাতির রসুন রয়েছে। মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের কিছু প্রজাতি সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি পেয়েছে।

আধুনিক চিকিৎসা গবেষণায় রসুনের প্রভাব নিয়ে নানা পরীক্ষা চালানো হয়েছে। কিছু গবেষণায় রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল কমাতে রসুনের সম্ভাব্য ভূমিকার কথা বলা হলেও, সব গবেষণার ফল একরকম নয়।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় রসুনের শক্তিশালী জীবাণুনাশক, ভাইরাস প্রতিরোধী ও ছত্রাকনাশক বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ ডায়েটেটিক অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র বাহি ভ্যান ডি বোর জানান, রসুনে পটাসিয়াম, ফসফরাস, জিংক ও সালফারসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান রয়েছে।

তার মতে, রসুনে থাকা অ্যালিসিন নামের যৌগ অন্ত্রের জন্য উপকারী প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে এবং হজমে সহায়তা করে। নিয়মিত ও পরিমিত রসুন গ্রহণ কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট ফাঁপার সমস্যাও কমাতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন এক থেকে দুই কোয়া কাঁচা রসুন নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত রসুন, বিশেষ করে খালি পেটে খেলে হজমের সমস্যা, গ্যাস বা অন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

অতএব, রসুন যতই উপকারী হোক না কেন, এর ক্ষেত্রেও পরিমিতিবোধ বজায় রাখাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

শেয়ার করুন