বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যশোরের রানা প্রতাপ হত্যাকাণ্ড: রাষ্ট্রীয় নীরবতা ও জাতীয় নিরাপত্তার গভীর সংকট

জেমস আব্দুর রহিম রানা
যশোরের মণিরামপুরে প্রকাশ্য স্থানে রানা প্রতাপ বৈরাগীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেবল একজন সাংবাদিকের মৃত্যু নয়; এটি দেশের আইনশৃঙ্খলা, চরমপন্থা দমন এবং জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক গভীর ব্যর্থতার প্রতিফলন। মাত্র একদিন আগে যশোর শহরে এক রাজনৈতিক নেতার নৃশংস হত্যা প্রশাসনের জন্য সরাসরি সতর্কবার্তা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। সেই সতর্কবার্তার পরও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় হত্যাকারীরা জনসমাগমের মধ্যেই হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, সামাজিক ভয় এবং অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রভাবের মিলিত ফলাফল হিসেবে দেখা দিতে পারে।
তদন্তে জানা গেছে, রানা প্রতাপ বৈরাগীর জীবনের বহুস্তরীয় দিকগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। তিনি নড়াইল থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন, তবে পত্রিকার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তিনি সম্পাদকের অনুপস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে পত্রিকাটি দখলের চেষ্টা করেছিলেন। সাংবাদিকতার এই পরিচয় তাকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে এবং অপরাধী নেটওয়ার্কের কাছে আড়াল সরবরাহ করেছে। তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে নিজেকে নির্দোষ ও দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন। এই সামাজিক পরিচয় রাষ্ট্রীয় নজরদারির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
রানা প্রতাপ ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতির পদেও নির্বাচিত ছিলেন। স্থানীয় অর্থনীতি ও শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ, তিনি একদিকে চরমপন্থা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করলেও, অন্যদিকে সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছিলেন। এই দ্বৈত পরিচয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য জটিল সমস্যা তৈরি করেছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, রানা প্রতাপকে হত্যার জন্য তিনজনের সক্রিয় পরিকল্পনা ছিল। একজন গুলি চালিয়ে প্রথম আঘাত করেছেন, আরেকজন মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিতে গলা কেটেছেন এবং তৃতীয়জন জনমনে ভয় সৃষ্টি করে হত্যাকারীদের পালানোর সুযোগ নিশ্চিত করেছেন। এই পরিকল্পনা প্রতিশোধমূলক নয়; এটি একটি সামাজিক বার্তা, যা দেখায় যে রাষ্ট্রের উপস্থিতি কার্যকর ছিল না। হত্যাকারীদের পেশাদারী দক্ষতা, স্থান ও সময়ের সম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং জনসমাগমের মধ্যেই আক্রমণ চালানোর সাহস প্রমাণ করে তারা দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করেছিলেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারের জনসমাগম এবং কপালিয়া ক্লিনিকের ভেতরে ও বাইরে একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেউ সরাসরি তথ্য দেয়নি। স্থানীয়রা মনে করেছেন প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে না, বা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এই সামাজিক নীরবতা এবং তথ্যচুর্ন অপরাধীদের জন্য উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছে। এটি দেখায়, জনগণের মধ্যে গভীর ভয় এবং প্রশাসনের প্রতি অবিশ্বাস অপরাধীদের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।
বর্তমান রাষ্ট্রীয় চরমপন্থা দমন নীতি মূলত গ্রেপ্তার, অভিযান এবং অস্ত্র ও বোমা উদ্ধার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। সহিংস অতীত থেকে সরে আসা ব্যক্তিদের জন্য পুনর্বাসন, সামাজিক স্বীকৃতি, মানসিক সহায়তা এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাঠামো অনুপস্থিত। এর ফলে যারা সহিংস পথ ত্যাগ করেছে, তারা পুনঃপ্রভাবক হিসেবে অপরাধী নেটওয়ার্কের কাছে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু দেশে চরমপন্থা দমন কৌশল কেবল গ্রেপ্তার ও অভিযান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; সেখানে পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, শিক্ষা, আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক সংযুক্তির সমন্বয় দ্বারা কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশে এই কাঠামোর অভাব সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।
রানা প্রতাপ বৈরাগীর ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংযোগও হত্যার প্রেক্ষাপটকে জটিল করেছে। ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি হিসেবে তার অবস্থান স্থানীয় শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই অর্থনৈতিক প্রভাব তাকে সামাজিক মর্যাদা প্রদান করেছিল, যা চরমপন্থা থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক। তবে একই সঙ্গে, অপরাধী নেটওয়ার্কের কাছে তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের এই দ্বৈততা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য জটিলতা তৈরি করেছে।
স্থানীয় জনগণের প্রতিক্রিয়া হত্যাকাণ্ডের ভয় এবং রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাসকে আরও সুস্পষ্ট করে। বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “আমরা অনেক কিছু দেখেছি, কিন্তু পুলিশকে কিছু বললে হয়তো কাজ হবে না। আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?” আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “রানা সাহেব অনেক মানুষের সাথে যুক্ত ছিলেন। তার হত্যায় আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারি না। যারা সত্যি তথ্য জানে, তারা মুখ খুলতে চায় না।” এই প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায়, জনমনের মধ্যে গভীর ভয়, সামাজিক নীরবতা এবং প্রশাসনের প্রতি অবিশ্বাস অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে।
ঘটনাস্থল কপালিয়া বাজার মণিরামপুর উপজেলার একটি ব্যস্ততম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। দিনের শুরু থেকে গভীর রাত অবধি লোকজনে পরিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও হত্যাকারীরা সহজে পালিয়ে যেতে পেরেছে। এটি রাষ্ট্রীয় কার্যকর উপস্থিতির অভাব, নিরাপত্তা পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং অপরাধী নেটওয়ার্কের দীর্ঘমেয়াদী কৌশল নির্দেশ করে।
আইন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা সহিংস অতীত থেকে সরে এসেছে, তাদের পুনর্বাসন কাঠামো, সামাজিক স্বীকৃতি এবং প্রশাসনিক নজরদারি ছাড়া পুনঃসহিংসতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। রানা হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রের শুধুমাত্র বাহিনী ও গ্রেপ্তারের ওপর নির্ভরতা চরমপন্থা ও অপরাধী নেটওয়ার্ক প্রতিরোধে ব্যর্থ।
প্রাথমিক পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যার পেছনে রয়েছে চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, নারীঘটিত বিষয় এবং চরমপন্থী গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে নিয়ন্ত্রিত চরমপন্থী গ্রুপ দীপংকরের সদস্য ছিলেন এবং পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ‘ক্যাডার’ হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে তিনি চরমপন্থা ত্যাগ করে সামাজিক ও ব্যবসায়িক জীবনে স্বাভাবিকভাবে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন।
রানা ও তার প্রাক্তন চরমপন্থী সহযোগী জিয়াউর রহমান জিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বও হত্যার পেছনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে চিহ্নিত। রানা কপালিয়া বাজারে নিজস্ব বরফকল স্থাপন করার পর জিয়ার সাথে লেনদেন বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বকেয়া থাকে। দুই মাস আগে জিয়া আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে গ্রেফতার হন। এছাড়া, ঝিনাইদহের আলোচিত আনার হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত চরমপন্থী নেতা শিমুল ভূঁইয়া গ্রুপের সঙ্গে ভারতের দীপংকর গ্রুপের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা হত্যাকাণ্ডকে আরও জটিল করেছে।
রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করেছে, আধুনিক চরমপন্থা আর গোপনে পাহাড়-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে না; বরং সমাজের মধ্যে নিজেকে স্বাভাবিক, সম্মানিত এবং নেতৃত্বশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ সহিংস নেটওয়ার্ক সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার আড়ালে নিজেদের রক্ষা ও পুনরায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
রাষ্ট্রীয় নীতি এবং সামাজিক কাঠামোর মিলিত ব্যর্থতা এই হত্যাকাণ্ডকে সম্ভব করেছে। প্রশাসন গ্রেপ্তার ও অভিযান চালাচ্ছে, তবে পুনর্বাসন, সামাজিক স্বীকৃতি এবং জনমুখী নিরাপত্তার কাঠামো অনুপস্থিত। আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর চরমপন্থা দমন কৌশলগুলোর মধ্যে পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা, শিক্ষা, আর্থিক সুরক্ষা এবং সামাজিক সংযুক্তির সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে এই সমন্বিত কাঠামো না থাকায় সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
মণিরামপুরের প্রকাশ্য বাজারে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আধুনিক চরমপন্থা আর আগের মতো গোপনে লুকিয়ে থাকে না; বরং তা সমাজের মধ্যে স্বাভাবিক, সম্মানিত এবং নেতৃত্বশীল হিসেবে উপস্থিত থাকে। রাষ্ট্র যদি পুনর্বাসন, সামাজিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক সুযোগ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের সঙ্গে সক্রিয় সংযোগ নিশ্চিত না করে, তবে ভবিষ্যতে আরও অনেক রানা প্রতাপ হারানো এবং আইন, প্রশাসন ও সমাজ—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রাষ্ট্র এখনই আইন, নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং জনমুখী নিরাপত্তার সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য। না হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক রানা প্রতাপ হারানো হবে এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা চরম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।
রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র এক নৃশংস অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে একাধিক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—চরমপন্থা কীভাবে সমাজে স্বাভাবিক রূপে প্রবেশ করে, অপরাধী নেটওয়ার্ক কীভাবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার আড়াল ব্যবহার করে, এবং রাষ্ট্র সেই মুখোশ ভেদ করতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে।
জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।
শেয়ার করুন