জেমস আব্দুর রহিম রানা (যশোর):
যশোরের মনিরামপুরে বরফকল ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক রানা প্রতাপ বৈরাগীকে (৪৫) গুলি করে ও গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ উদঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত কাউকেও আটক করা সম্ভব হয়নি। ফলে একটি পরিকল্পিত ও প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের পরও তদন্তের অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
এ ঘটনায় নিহতের পিতা তুষার কান্তি বৈরাগী (৬৪) অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার মনিরামপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি মনিরামপুর থানার মামলা নম্বর ১৪। তবে মামলা দায়েরের পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় নিহতের পরিবার ও সহকর্মীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজার এলাকায় প্রকাশ্য স্থানে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী যশোরের কেশবপুর উপজেলার আড়–য়া গ্রামের বাসিন্দা এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে। তিনি কপালিয়া বাজারে একটি বরফ তৈরির কারখানার মালিক ছিলেন। পাশাপাশি কেশবপুর উপজেলার কাটাখালী বাজারে তাঁর একটি মাছের আড়ৎ ছিল। এর পাশাপাশি তিনি নড়াইল থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘বিডি খবর’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেলে রানা প্রতাপ বৈরাগী কপালিয়া বাজারের বরফকলে অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে করে আসা তিনজন দুর্বৃত্ত তাঁকে বরফকল থেকে ডেকে পাশের কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে একটি গলিতে নিয়ে যায়। সেখানে খুব কাছ থেকে তাঁর মাথায় গুলি করা হয় এবং পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায়, ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহতের বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী বলেন, “আমার ছেলে শুধু ব্যবসায়ী না, সাংবাদিকও ছিল। সে কোনো অন্যায়কে ভয় পেত না। এলাকায় সে খুব পরিচিত ও জনপ্রিয় ছিল। সোমবার বিকেলে বরফকলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যুর খবর পাই। আমি আমার ছেলে হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।
তিনি আরও বলেন, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্যে ঘটল, অথচ একদিন পেরিয়ে গেলেও কেউ ধরা পড়ল না—এটা খুবই দুঃখজনক।
পুলিশ সূত্র জানায়, নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগীর বিরুদ্ধে অভয়নগর থানায় একটি হত্যা মামলা এবং কেশবপুর থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রজিউল্লাহ খান বলেন, “হত্যার কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।” তিনি জানান, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গ থেকে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মনিরামপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ইমদাদুল হক বলেন, “হত্যার পেছনের কারণ উদঘাটনে একাধিক দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। আশা করছি, দ্রুতই রহস্য উন্মোচন করা যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের পরপরই সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, ডিবি ও পুলিশের একাধিক দল যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে। তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজনকে আটক করা সম্ভব হয়নি। কারা, কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে—সে বিষয়ে প্রশাসনের কাছে এখনও কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই।
এদিকে সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ, ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রকাশ্য স্থানে এমন নৃশংস হত্যার পরও দ্রুত কোনো অগ্রগতি না থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। তারা অবিলম্বে হত্যাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।





