শনিবার, ২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশে ফোনে নকল আইএমইআই ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র

বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ক্লোনিং যে কতটা ব্যাপক ও দীর্ঘদিন ধরে চলমান, তার একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর)-এর সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে। গত ১ জানুয়ারি এনইআইআর কার্যকর হওয়ার পর সংগৃহীত ডেটা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে কোটি কোটি ডিভাইস বছরের পর বছর ধরে ডুপ্লিকেট কিংবা ভুয়া ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (আইএমইআই) নম্বর ব্যবহার করে সক্রিয় ছিল।

এনইআইআরের তথ্যে দেখা যায়, একটি মাত্র আইএমইআই নম্বর—৪৪০০১৫২০২০০০—ব্যবহার করে একসঙ্গে সচল ছিল ১৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮টি মোবাইল ফোন। একইভাবে ৩৫২২৭৩০১৭৩৮৬৩৪ আইএমইআই নম্বরটি ব্যবহার হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার ডিভাইসে এবং ৩৫২৭৫১০১৯৫২৩২৬ নম্বরটি ব্যবহৃত হয়েছে ১৫ লাখ ২০ হাজার ফোনে। আরও বিস্ময়করভাবে, কোনো বৈধ আইএমইআই না থাকলেও শুধুমাত্র ‘০’ আইএমইআই ব্যবহার করে চালু ছিল ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি হ্যান্ডসেট।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি উঠে এসেছে গত এক দশকের রেকর্ড বিশ্লেষণে। এনইআইআরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’ আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করেই বিভিন্ন পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি সংযোগ সচল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল ক্লোনিংয়ের ভয়াবহতা বোঝাতে এই একটি তথ্যই যথেষ্ট।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, ‘০০০০০০০০০০০০০’, ‘১১১১১১১১১১১১১’ এবং ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’—এ ধরনের প্লেসহোল্ডার আইএমইআই ব্যবহার করেও লাখ লাখ হ্যান্ডসেট দেশের নেটওয়ার্কে সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ পর্যন্ত অন্তত ২৪টি ভুয়া বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এক লাখের বেশি মোবাইল ফোন। এর মধ্যে কয়েকটি আইএমইআইয়ের সঙ্গে সংযুক্ত ডিভাইসের সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি সুসংগঠিত ক্লোনিং নেটওয়ার্কের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়।

এত বিপুল পরিমাণ অনিয়ম শনাক্ত হলেও এসব ফোন এখনই বন্ধ করা হচ্ছে না। সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি এড়াতে এনইআইআরের মাধ্যমে আপাতত এসব ডিভাইসকে ‘গ্রে’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন, দেশে কোটি কোটি মানুষ অজান্তেই নিম্নমানের নকল মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন, যেগুলো কখনোই রেডিয়েশন বা এসএআর পরীক্ষার আওতায় আসেনি। তবে হঠাৎ করে এসব ফোন বন্ধ করে দিলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা মারাত্মক সমস্যায় পড়বেন। সে কারণে আপাতত এগুলো বন্ধ না করে গ্রে হিসেবে ট্যাগ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে মোবাইল অপারেটররা আইওটি ডিভাইস—যেমন সিসিটিভি বা সিমভিত্তিক যন্ত্র—ও সাধারণ মোবাইল ফোনের মধ্যে সঠিক পার্থক্য করতে না পারায় কিছু ক্ষেত্রে আইএমইআই ডুপ্লিকেশন ঘটেছে। বর্তমানে বৈধভাবে আমদানি করা আইওটি ডিভাইসগুলো আলাদা করে শনাক্ত ও ট্যাগ করা হচ্ছে।

এনইআইআরের তথ্য বিশ্লেষণে গ্রে মার্কেটের বিস্তৃত দাপটও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার আইফোন সক্রিয় থাকলেও এর মধ্যে আনুমানিক ১৯ লাখ ৫০ হাজার ফোনই বৈধভাবে আমদানি করা হয়নি। একইভাবে দেশে সক্রিয় ২ কোটি ৩১ লাখ স্যামসাং ফোনের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ কর ফাঁকি দিয়ে বাজারে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ১০টি আইএমইআই ব্যবহার করে প্রায় ৫০ লাখ ফোন সচল থাকার তথ্য গ্রে মার্কেটের গভীর ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের স্পষ্ট প্রমাণ।

অবৈধ ও ক্লোন করা ফোনের সঙ্গে ডিজিটাল অপরাধের সরাসরি যোগসূত্রও উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে সংঘটিত মোট ডিজিটাল জালিয়াতির ৭৩ শতাংশই সংঘটিত হয়েছে অনিবন্ধিত ডিভাইস ব্যবহার করে। অন্যদিকে, বিটিআরসি ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের যৌথ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সংঘটিত ই-কেওয়াইসি জালিয়াতির ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে অবৈধ বা রিপ্রোগ্রাম করা ফোন। একই বছরে দেশে ১ লাখ ৮০ হাজার মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যার অধিকাংশই আর উদ্ধার হয়নি।

এনইআইআরের এসব তথ্য প্রকাশের পর গত ১ জানুয়ারি বিটিআরসি কার্যালয়ে সংঘটিত সহিংস বিক্ষোভের ঘটনাকেও নতুন প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ করহার ব্যবসায়ীদের গ্রে মার্কেটে ঠেলে দিচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কর কাঠামো যাই হোক না কেন, ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে নকল ফোনকে ‘অফিশিয়াল নতুন’ হিসেবে বাজারজাত করার এই চক্র ভেঙে দেওয়া এখন জরুরি।

শেয়ার করুন