যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, ২০২৫ সালের সামরিক কর্মকাণ্ড তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে পুরোপুরি মিলছেই না। অরাজনৈতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা (এসিএলইডি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন অন্তত সাতটি দেশে সরাসরি বা অংশীদারিত্বে ৬২২টি বোমা হামলা পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা হলো, শুক্রবার রাত থেকে ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলার সূচনা।
যেসব দেশে অভিযান চালানো হয়েছে
সিরিয়া:
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সিরিয়ার আইএসের প্রায় ৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। পালমিরায় একজন মার্কিন সেনার নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন এই অভিযানকে ‘প্রচণ্ড প্রতিশোধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইরান:
২২ জুন ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্র নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই হামলা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর জবাবে ইরান কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালালেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
ইরাক:
মার্চে আল-আনবার প্রদেশে আইএসের শীর্ষ নেতা আবদাল্লাহ আবু খাদিজাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালায়। ট্রাম্প এটিকে ‘শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপন’ নীতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
ইয়েমেন:
মার্চ থেকে মে পর্যন্ত হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান ও নৌ হামলা পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বন্দর, বিমানবন্দর এবং সামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, এসব হামলায় শতাধিক বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
নাইজেরিয়া:
২৫ ডিসেম্বর উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ায় আইএস সম্পর্কিত একটি গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে প্রথমবারের মতো সরাসরি বিমান অভিযান চালানো হয়। ওয়াশিংটন দাবি করেছে, এতে একাধিক সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। নাইজেরিয়ার সরকার অভিযানকে সফল বলে ঘোষণা করেছে, তবে নিহত ও আহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
সোমালিয়া:
২০২৫ সালে সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার সংখ্যা অতীতের সব প্রশাসনকে ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ১১১টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে অনেক বেসামরিক ব্যক্তি, এমনকি শিশু নিহত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল:
সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলাগামী নৌযানগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরু করে। ওয়াশিংটন দাবি করে, এসব নৌযান মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ৯৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র’ চালানোর অভিযোগ তুলেছে।
মুসলিম-প্রধান দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্তত সাতটি দেশে হামলার মধ্যে ছয়টি মুসলিম-প্রধান। একমাত্র ভেনেজুয়েলা ছিল খ্রিস্টধর্মপ্রধান। তবে শুক্রবার রাত থেকে তেলসমৃদ্ধ এই দেশে হামলা শুরু হওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।
প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে অংশগ্রহণ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে সাতটি দেশে ধারাবাহিক ও সরাসরি সামরিক অভিযান তার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই সক্রিয় সামরিক নীতি ২০২৬ সালে আরও নতুন সংকট এবং উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।





