শনিবার, ২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা ও দাফন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে শেষ দুই-তিন দিনে কোনো ভালো খবর আসেনি। যতবারই চিকিৎসকরা ব্রিফিং দিয়েছেন, বলা হয়েছে তার অবস্থা সংকটাপন্ন। সর্বশেষ সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) দিবাগত মধ্যরাতে মেডিক্যাল বোর্ডের তৎপরতা বেড়ে যায়।

রাত ১০টা ১০ মিনিটে হাসপাতালে পৌঁছান খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মাকে দেখে রাত ১টা ৫৪ মিনিটে পরিবারের সদস্যসহ হাসপাতাল ত্যাগ করেন। পরে আবার হাসপাতালে আসেন তিনি। এদিন একাধিকবার হাসপাতালে আসেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।

এদিন হাসপাতাল যান খালেদা জিয়ার বড় বোন সেলিনা ইসলাম, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান, আরাফাত রহমান কোকোর কন্যা জাহিয়া রহমান। রাত ১০টা ২৩ মিনিটে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও হাসপাতালে উপস্থিত হন।

হাসপাতালে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এএসএফ, পিজিআর, বিজিবি, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকেন। কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে হাসপাতালের প্রধান ফটক ঘিরে ফেলা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তায় সিএসএফ সদস্যরাও ছিলেন।

রাত সোয়া ২টায় মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের ব্রিফিং দেন। কান্না বিজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।

এরপর মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় বিএনপির মিডিয়া সেল জানায়, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই দেশ-বিদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা একে একে শোক প্রকাশ করেন।

সকাল সাড়ে ৮টায় এভার কেয়ার হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ সময় তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। মির্জা ফখরুল বলেন, “জাতি অভিভাবক হারালো। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।” দলের পক্ষ থেকে সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেন রুহুল কবির রিজভী।

সকাল থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীরা হাসপাতাল ভিড় করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের সামনের দুই রাস্তা লোকারণ্য হয়ে ওঠে। অনেকে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও হাসপাতালে ছুটে আসেন।

সরকার বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে। সাধারণ ছুটি থাকবে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণে সরকারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন স্থগিত করা হয়।

বেগম খালেদা জিয়ার শেষ নিঃশ্বাসের সময় পাশে ছিলেন তারেক রহমান, ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, বড় বোন সেলিনা ইসলাম, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকরা।

ডা. মো. শাহাবুদ্দিন তালুকদার সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, “ভোর ৬টায় তাকে ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষণা করা হয়। গত ২৩ নভেম্বর থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।”

তারেক রহমান ফেসবুকে লিখেছেন, “আমার মায়ের প্রতি দেশবাসীর আবেগ, ভালোবাসা ও বৈশ্বিক শ্রদ্ধায় আমরা চিরকৃতজ্ঞ। আপনারা মায়ের জন্য দোয়া করবেন।” তিনি আরও বলেন, “মা ছিলেন পরিবারের সত্যিকারের অভিভাবক এবং দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথপ্রদর্শক।”

জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বুধবার দুপুর ২টায় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তিনি স্বামী শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন হবেন। সাধারণ জনগণ নিরাপত্তার কারণে প্রবেশ করতে পারবেন না।

খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থরাইটিস, লিভার সিরোসিস ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন। ২৩ নভেম্বর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে মেডিক্যাল বোর্ড চিকিৎসা কার্যক্রম চালাচ্ছিল।

শেয়ার করুন