শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ভুয়া ছবি ও ডিপফেক এখন সাংবাদিকতার বড় চ্যালেঞ্জ : শফিকুল আলম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুত বদলে দিচ্ছে সাংবাদিকতার চেনা কাঠামো। কাজের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ভুল তথ্য, ভুয়া ছবি ও ডিপফেকের ঝুঁকি। এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতার মূল নৈতিকতা অটুট রেখে এআই ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ডিআরইউ সদস্যদের জন্য আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘এআই-পাওয়ার্ড জার্নালিজম : অপারচুনিটি, রিস্ক অ্যান্ড ডিজিটাল সিকিউরিটি’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন গেমপ্লিফাই এক্সওয়াইজেডের সিইও মাহফুজুর রহমান এবং ডিআরইউ তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাহমুদ সোহেল।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুল আলম বলেন, “সাংবাদিকতা এআই-নির্ভর হোক বা না হোক, এর গোল্ডেন স্ট্যান্ডার্ড বা মৌলিক নীতিমালা কখনোই বদলাবে না। প্রতিটি তথ্যের সুনির্দিষ্ট সূত্র থাকতে হবে এবং প্রতিটি উদ্ধৃতি হতে হবে শতভাগ নির্ভুল। এই জায়গায় কোনো আপসের সুযোগ নেই।”

তিনি উল্লেখ করেন, সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে এআই সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে পারে। আগে যেখানে একজন সাংবাদিকের উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশের মতো ছিল, সেখানে এখন তা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এআই টুলের সহায়তায় একজন সাংবাদিক একাই কোনো নির্দিষ্ট খাত—যেমন শিপিং, কৃষি গবেষণা বা জলবায়ু—নিয়ে বড় আকারের ওয়েবসাইট বা তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করতে পারেন। এতে ক্যারিয়ারের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং গভীর ও বিশেষায়িত সাংবাদিকতার ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছে।

তবে এআইয়ের ভয়ংকর দিক হিসেবে তিনি তুলে ধরেন ভুয়া ছবি, ভিডিও ও ফটোকার্ডের অপব্যবহার। এআই ব্যবহার করে দীর্ঘ বক্তৃতা বা বক্তব্যকে এমনভাবে কাটছাঁট ও বিকৃত করা যায়, যা দেখে বা শুনে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল বক্তব্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের কনটেন্ট সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং জনমত প্রভাবিত করার হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে বলে সতর্ক করেন তিনি।

শফিকুল আলম বলেন, “ডিপফেকের কারণে এখন প্রতিনিয়ত ফটোকার্ডের অত্যাচার শুরু হয়েছে। আমিই এর শিকার হয়েছি। আমার ২৭ মিনিটের বক্তব্য এমনভাবে জোড়াতালি দিয়ে এক মিনিটে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা অবিশ্বাস্য। তাই যারা এআই জানেন না, তাদের সাংবাদিকতা করা উচিত নয়। এআই জানা এখন আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। যতদিন আমরা প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর না হব, ততদিন সাংবাদিকদের ফ্যাক্টচেকারের ভূমিকা পালন করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা এক্সের মতো বড় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ‘ফ্রিডম অব প্রেস’-এর যুক্তি দেখিয়ে অনেক সময় ঘৃণা ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। অথচ এসব প্ল্যাটফর্মের কার্যকর দায়বদ্ধতা নেই।

প্রেস সচিব স্মরণ করিয়ে দেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ঘৃণামূলক প্রচারণার কারণে রোহিঙ্গাদের মতো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জীবন বিপন্ন হয়েছে এবং ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। নিজস্ব প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা না থাকায় অনেক দেশই এসব বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

শফিকুল আলম মনে করেন, এআইয়ের অপব্যবহার গণতন্ত্রের জন্যও বড় হুমকি। নির্বাচন প্রভাবিত করা, সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার ঘটনা বাড়ছে। তাই এআই ব্যবহারে নৈতিকতা ও কার্যকর নজরদারি জরুরি।

তিনি আরও বলেন, এআই লিটারেসি বা এআই শিক্ষা এখন বাধ্যতামূলক। এটি ছাড়া সাংবাদিকতা করা অসম্ভব। এটি শুধু ক্যারিয়ারের জন্য নয়, বরং ভুয়া তথ্য ও ডিপফেক শনাক্ত করে গণতন্ত্র ও সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার জন্যও প্রয়োজন।

শফিকুল আলম বলেন, যারা বলেন তারা এআই জানেন না, বর্তমান সময়ে তাদের সাংবাদিকতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির দুই হাজারের বেশি সদস্যসহ সব সংবাদকর্মীর প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা এআই শেখেন—একদিকে কাজের মান বাড়াতে, অন্যদিকে ভয়ংকর ভুয়া তথ্য দ্রুত শনাক্ত করতে।

সমাপনী বক্তব্যে ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন ভারতীয় ও ভিনদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত প্রযুক্তিগত জ্ঞান কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাংবাদিকদের প্রস্তুত করতেই এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রশিক্ষণের আয়োজন।

তিনি আরও বলেন, কোন কনটেন্ট এআই দ্বারা তৈরি এবং কোনটি নয়, তা যাচাই করার সক্ষমতা সাংবাদিকদের জন্য অপরিহার্য। এআই কীভাবে কাজ করে এবং এর সীমাবদ্ধতা জানা ছাড়া দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। তবে এআই সাংবাদিকের বিকল্প নয়, বরং শক্তি বাড়ানোর হাতিয়ার।

শেয়ার করুন