সর্বশেষ সংশোধিত অধ্যাদেশে এনটিএমসিকে (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার) বাতিল করে নতুনভাবে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট’ (সিআইএস) গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোতে বৈধ ইন্টারসেপশন কেবল আধা-বিচারিক অনুমোদন এবং সংসদীয় তদারকির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। পাশাপাশি ‘স্পিচ অফেন্স’ সংক্রান্ত বিধান সংশোধন করে শুধুমাত্র সহিংসতার আহ্বানকে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে।
সরকারের দাবি, সংশোধিত অধ্যাদেশ টেলিযোগাযোগ খাতে মানবিক মানোন্নয়ন, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সংস্কার এবং নজরদারি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। এটি আন্তর্জাতিক উত্তম অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাতকে আরও গণতান্ত্রিক, বিনিয়োগবান্ধব এবং নাগরিক অধিকার সংরক্ষণমূলক করে তুলবে। উল্লেখযোগ্যভাবে, নতুন আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে কোনো পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ করা যাবে না। ধারা ৯৭-এর মাধ্যমে এই বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে, ফলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কোনো সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশব্যাপী বা আংশিক ইন্টারনেট শাটডাউনের সুযোগ থাকবে না।
এছাড়া, ২০১০ সালের বিতর্কিত সংশোধনমূলক কাঠামো থেকে সরে এসে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসির ক্ষমতা ও কার্যপরিধির মধ্যে ভারসাম্য আনা হয়েছে। আগে সব ধরনের লাইসেন্স অনুমোদনের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকলেও এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু লাইসেন্সের অনুমোদন স্বাধীন গবেষণার ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় দেবে, আর বাকি সব লাইসেন্স ইস্যুর এখতিয়ার বিটিআরসির হাতে থাকবে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নেতৃত্বে ‘জবাবদিহিতা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম তদারকিতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি লাইসেন্স আবেদন থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে এবং উচ্চ ও পুনরাবৃত্তিমূলক জরিমানা কমানো হয়েছে, যা খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে।
বিটিআরসির স্বচ্ছতা বাড়াতে প্রতি চার মাসে গণশুনানি আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব গণশুনানির সিদ্ধান্ত ও ফলোআপ বিটিআরসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট রোধের জন্যও নির্দিষ্ট বিধান সংযোজন করা হয়েছে (ধারা ৮৭)।
নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সিম ও ডিভাইস রেজিস্ট্রেশনের তথ্যের অপব্যবহার করে নাগরিকদের নজরদারি বা হয়রানি করলে তা আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে (ধারা ৭১)।
‘স্পিচ অফেন্স’ সংক্রান্ত বিধান সংশোধন করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা হয়েছে। এখন থেকে কেবল সহিংসতার আহ্বানকে অপরাধ হিসেবে ধরা হবে (ধারা ৬৬ক)।
টেলিযোগাযোগ সেবায় গ্রাহক ও অপারেটরের জন্য আপিল ও সালিশ ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে (ধারা ৮২খ)। আইনানুগ ইন্টারসেপশন ও বৈধ নজরদারির সংজ্ঞা, পরিধি এবং প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত কারিগরি সহায়তার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘সেন্টার ফর ইনফর্মেশন সাপোর্ট’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে (ধারা ৯৭ক)।
জাতীয় নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জরুরি প্রাণরক্ষা, বিচারিক বা তদন্ত কার্যক্রম এবং আন্তঃসীমান্ত বিষয়ক কেবল নির্দিষ্ট আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ইন্টারসেপশন করা যাবে। সিআইএস নিজে কোনো ইন্টারসেপশন পরিচালনা করবে না, বরং শুধুমাত্র কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। আধা-বিচারিক কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া কোনো ইন্টারসেপশন সম্ভব হবে না (ধারা ১৭ক)। এতে রাজনৈতিক নজরদারি, অপব্যবহার ও ব্ল্যাকমেইলিং রোধে কার্যকর ভূমিকা আশা করা হচ্ছে।
আইনানুগ ইন্টারসেপশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি আধা-বিচারিক কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এতে বেআইনি ইন্টারসেপশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা যাবে। কাউন্সিলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী (সভাপতি), প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং স্বরাষ্ট্র সচিব সদস্য হিসেবে থাকবেন।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বছরে একবার আইনানুগ ইন্টারসেপশন বিষয়ে জাতীয় প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এতে ইন্টারসেপশনের ক্ষেত্র, বাজেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া ইমেজ ও ভয়েস প্রোটেকশন, সিম ও ডিভাইস ডেটা সুরক্ষা বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংশোধিত অধ্যাদেশের সব ব্যবস্থাপনা জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) এবং আন্তর্জাতিক উত্তম অনুশীলনের সঙ্গে মিল রেখে কার্যকর করা হবে।





