সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গুলির আগেই বান্ধবীকে ‘দেশ কাঁপানোর’ বার্তা দেন ফয়সাল

হত্যাচেষ্টার ঘটনার আগের রাতেই বড় ধরনের সহিংসতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন শুটার ফয়সাল। ঢাকার সাভারের একটি রিসোর্টে অবস্থানকালে তিনি তার কথিত বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমাকে জানান, পরদিন এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে—যা ‘সারা দেশ কাঁপাবে’। ঠিক পরদিনই রাজধানীর পল্টন এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে বক্স কালবার্ট রোডে জুলাই যোদ্ধা শরিফ ওসমান বিন হাদির ওপর গুলি চালানো হয়। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া এসব তথ্য সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন করে চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের এক সাবেক কাউন্সিলর ছিলেন এই হত্যাচেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী। অন্তত ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র হামলার পরিকল্পনা, অর্থের জোগান, অস্ত্র সরবরাহ, পালিয়ে যাওয়া এবং সীমান্ত পারাপারে সহায়তায় যুক্ত ছিল।

র‍্যাব ও পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ম্যাগাজিন এবং কয়েক কোটি টাকার চেক উদ্ধার হয়েছে। রিমান্ডে নেওয়া আসামিদের কাছ থেকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, আরও একাধিক শুটার গ্রুপ মাঠে সক্রিয় থাকতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে পুলিশের ধারণা, পরিকল্পিত সহিংসতায় জড়িত একাধিক সশস্ত্র দল এখনও সক্রিয় রয়েছে। তাই সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের অবস্থান শনাক্ত করতে গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ দল একযোগে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের কর্নেল গলিতে ফয়সালের বোনের বাসার নিচ থেকে হত্যাচেষ্টায় ব্যবহৃত দুটি ম্যাগাজিন ও ১১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে র‍্যাব। র‍্যাব জানায়, ম্যাগাজিন ও গুলি বাসা থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রসহ দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, একটি খেলনা পিস্তল ও ৪১ রাউন্ড গুলি নরসিংদী সদর উপজেলার তরুয়া এলাকার মোল্লার বাড়ির সামনে একটি বিলের পানির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। শুটার ফয়সালের বাবা হুমায়ুন কবির ও মা মোসাম্মাৎ হাসি বেগমকে র‍্যাব-৩ গ্রেপ্তার করে পরে মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।

এ নিয়ে ওসমান হাদির ওপর হত্যাচেষ্টার ঘটনায় এখন পর্যন্ত র‍্যাব ও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন নয়জন।

ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরের করা হত্যাচেষ্টা মামলাটি বর্তমানে ডিএমপির পল্টন থানায় তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রিমান্ডে পাওয়া তথ্যে বেরিয়ে এসেছে—ঘটনার আগেই হামলার বিষয়টি জানতেন ফয়সালের কথিত বান্ধবী মারিয়া। হামলার আগের রাতে, বৃহস্পতিবার, ফয়সাল ও আলমগীর সাভারের গ্রিন জোন রিসোর্টের ২০৪ নম্বর কক্ষে অবস্থান করেন। সেখানে মারিয়াও ছিলেন। ওই সময় ফয়সাল তাকে বলেন, ‘কাল (শুক্রবার) এমন কিছু হবে, সারা দেশ কাঁপবে।’

শুক্রবার সকাল ৮টা ২৭ মিনিটে তারা একসঙ্গে রিসোর্ট ছাড়েন এবং ঢাকায় ফেরেন। যাওয়ার আগে ফয়সাল মারিয়াকে তিন হাজার টাকা দেন।

গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট ছিল ভুয়া। ঘটনার পর ফয়সাল ও আলমগীর আগারগাঁওয়ের কর্নেল গলিতে ফয়সালের বোন জেসমিনের বাসায় আশ্রয় নেন। সেখানে ফয়সালের বাবা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। তিনি মোটরসাইকেলের আসল নম্বর প্লেট লাগিয়ে দেন এবং ফয়সালকে পালানোর জন্য গাড়ির ব্যবস্থাও করেন। এ ছাড়া ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া তার ভাই ওয়াহিদ আহমেদ শিপুর মাধ্যমে বিকাশে মোট ৪০ হাজার টাকা পাঠান। তবে জিজ্ঞাসাবাদে সামিয়া দাবি করেছেন, হামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না এবং ফয়সাল নিয়মিত বাসায় থাকতেন না। তিনি নিজেকে ফয়সালের দ্বিতীয় স্ত্রী বলেও জানান।

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত যাত্রায় ব্যবহৃত প্রাইভেট কারের চালক বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তার তথ্যের ভিত্তিতে আরেক চালককেও নজরদারিতে রাখা হয়েছে, যিনি ময়মনসিংহগামী গাড়িটি ভাড়া করে দেন। পুলিশ জানায়, ওই চালককে গ্রেপ্তার করা গেলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে তিনি ফোন ও নম্বর পরিবর্তন করে আত্মগোপনে রয়েছেন।

এ ছাড়া ফয়সালের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েক কোটি টাকার চেক নিয়ে তদন্তকারীদের ধারণা, হামলার মিশন বাস্তবায়নের জন্য চুক্তিবদ্ধ অর্থের অংশ হিসেবেই এসব চেক রাখা হয়েছিল।

শেয়ার করুন