গত এক বছরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব, রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং কট্টর মন্তব্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ঘৃণাসূচক বক্তব্য, বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য এবং কঠোর নীতি প্রবর্তনের দাবি এখন রাজনৈতিক আলোচনার মূল অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এক সময় যা চরম ডানপন্থিদের প্রান্তিক অবস্থান হিসেবে ধরা হতো, তা আজ ইউরোপের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। গত বছর লন্ডনের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। ‘তাদের দেশে ফিরিয়ে দাও’ শ্লোগানে মুখর এসব সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা অভিবাসনকে জাতীয় পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সময়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কিছু রাজনীতিক টেলিভিশনে বিতর্কিত মন্তব্য করেন, এমনকি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিদেশে জন্ম নেওয়া নাগরিকদের বহিষ্কারের দাবি পর্যন্ত উঠেছে।
এই প্রবণতা কেবল যুক্তরাজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জার্মানির অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি), ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি এবং যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে দলগুলো জনমত জরিপে শীর্ষ বা শীর্ষের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এসব দল অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতি এবং কঠোর আইন প্রবর্তনের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও নীতি ইউরোপে কট্টর মনোভাবকে উৎসাহিত করছে। সম্প্রতি অভিবাসনকে ‘সভ্যতার জন্য হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল এবং ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী মন্তব্য ইউরোপীয় চরম ডানপন্থীদের ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে দেখা হচ্ছে।
গত দশকে ইউরোপে অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা লাখো আশ্রয়প্রার্থী এই প্রবণতার একটি বড় কারণ। যদিও মোট অভিবাসনের মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, তবু অর্থনৈতিক স্থবিরতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভাজনমূলক প্রচার এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান অভিবাসনবিরোধী মনোভাবকে আরও তীব্র করছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের পলিসি ইউনিটের পরিচালক ববি ডাফির বলেন, যুক্তরাজ্যে জাতীয় বিভাজন এবং পতনের অনুভূতি বাড়ায় মানুষকে রাজনৈতিক চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, ব্রেক্সিট বিতর্ক এবং কোভিড-১৯ মহামারি এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে। এছাড়া সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে এক্স (সাবেক টুইটার), বিভাজনমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাজ্যে পুলিশি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে এক বছরে ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি ঘৃণাজনিত অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অনেকে দাবি করেন, তারা বর্ণ নয়, বরং সামাজিক সংহতি ও একীভূতকরণের জন্য উদ্বিগ্ন। কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলছেন, তারা ক্রমবর্ধমান বর্ণবিদ্বেষ এবং হুমকির মুখোমুখি হচ্ছেন। ব্রিটিশ কৃষ্ণাঙ্গ এমপি ডন বাটলার জানান, সামাজিক মাধ্যমে তার প্রতি ঘৃণামূলক মন্তব্য ও মৃত্যুহুমকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
ডানপন্থীদের মোকাবিলায় ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোও অভিবাসন নীতি নিয়ে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করছে। যুক্তরাজ্যের লেবার সরকার অভিবাসন নীতি কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছে, যদিও তারা প্রকাশ্যে বর্ণবাদের নিন্দা জানাচ্ছে। ডেনমার্কের মতো দেশগুলো থেকে উদ্ভাবিত অস্থায়ী আশ্রয়প্রার্থীদের বাসস্থান নীতিও বিবেচনার মধ্যে রাখা হচ্ছে।





