শনিবার, ২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মাথায় গুলি লাগার পরও মালালা ইউসুফের বেঁচেফেরা

মালালা ইউসুফজাইয়ের জীবন ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর এক মুহূর্তের জন্য বিপর্যয়ে পরিণত হয়। একটি গুলি তার মাথার এক পাশ দিয়ে প্রবেশ করে এবং প্রায় তার পুরো শরীরকে স্থবির করে দিতে পারত। চিকিৎসকেরা তখন আশার আলো দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে মালালার অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তা এবং সময়মতো চিকিৎসার কারণে তিনি বেঁচে ফিরে আসেন। এ ঘটনার পর তিনি কেবল জীবনরক্ষার জন্য নয়, বরং নারী শিক্ষার অধিকার ও শিক্ষার প্রসারের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে একটি প্রতীকী চরিত্র হয়ে ওঠেন। এই অবদানের স্বীকৃতিতে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং বিশ্বের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ঘটনাস্থল ছিল পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের সোয়াত উপত্যকা। ১৫ বছর বয়সী মালালা তার বন্ধুদের সঙ্গে একটি বাসে স্কুলের দিকে যাচ্ছিলেন, যা সাধারণ একটি সকালের যাত্রার মতোই ছিল। হঠাৎ তালেবানের এক বন্দুকধারী বাসে উঠে মালালার দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিটি তার মাথায় আঘাত হানার সময় কানের পাশ দিয়ে মস্তিষ্কের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে আঘাত করতে পারত। আঘাতটি এতটাই গুরুতর ছিল যে, প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনিশ্চিত ছিল। হামলার সময় তার সঙ্গে থাকা বন্ধু কাইনাত রিয়াজ এবং শাজিয়া রমজানও আহত হন।

মালালাকে দ্রুত পেশোয়ারের একটি সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তার অবস্থা চরম সংকটাপন্ন ছিল। সেনা নিউরোসার্জন কর্নেল জুনায়েদ খান পরীক্ষা করে পেয়েছিলেন যে, মালালার জীবন এখন অস্থিতিশীল। চার ঘণ্টার মধ্যেই তার মস্তিষ্কে ফোলা বেড়ে যাওয়ার কারণে তার জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। জরুরি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রথমে মালালার পরিবার অস্ত্রোপচারে রাজি ছিলেন না। তারা জুনায়েদ খানের কম বয়স ও তুলনামূলক অভিজ্ঞতার কারণে সন্দিহান ছিলেন। তারা চাইছিলেন, মালালাকে বেসামরিক চিকিৎসকের দেখাশোনা বা দুবাইয়ে স্থানান্তর করার চেষ্টা করা হোক। কিন্তু কর্নেল জুনায়েদ খান তার পরিবারকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, অস্ত্রোপচার না করলে মালালার মৃত্যু হতে পারে, অথবা সে কথা বলার ক্ষমতা হারাতে পারে, কিংবা ডান হাত-পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে।

মধ্যরাতে অস্ত্রোপচার শুরু হয়। অপারেশনের মাধ্যমে খুলির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সরানো হয়, মস্তিষ্কে জমা রক্ত পরিষ্কার করা হয় এবং মালালাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। এটি তার জীবন রক্ষায় সহায়ক হয়। তবে পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমস্যার কারণে তাকে মেডিক্যালি ইন্ডিউসড কোমায় রাখা হয়, এবং তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি ব্যক্তিগত উদ্যোগে মালালাকে বিদেশে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেন। যুক্তরাজ্যের কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে তার চিকিৎসা চালু হয়, যা বিশেষভাবে যুদ্ধময় অঞ্চলের আহতদের জন্য খ্যাত। এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।

চিকিৎসকরা বলেছিলেন, মালালার বেঁচে থাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, গুলি সরাসরি মস্তিষ্কে প্রবেশ করেনি। দ্বিতীয়ত, সময়মতো চিকিৎসা এবং জরুরি অস্ত্রোপচার তার জীবন বাঁচাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তৃতীয়ত, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং উন্নত মেডিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তার প্রাণ রক্ষা সম্ভব হয়েছে। বার্মিংহামের বিশেষ পরীক্ষা অনুযায়ী, মালালার কোনো বড় নিউরোলজিক্যাল ক্ষতি হয়নি।

চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপে মালালার ক্ষত মেরামত করা হয়। মুখের পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারে হাড় ও স্নায়ুর ক্ষতির সমাধান করা হয়, কানের পর্দার ক্ষতি ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্টের মাধ্যমে ঠিক করা হয় এবং খুলির ক্ষত স্থানীয় টাইটানিয়াম প্লেট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মালালা হাঁটতে, লিখতে, পড়তে এবং হাসতেও সক্ষম হন। প্রথমদিকে ট্র্যাকিওটমির কারণে কথা বলতে না পারলেও, তিনি কাগজের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখতেন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া দেওয়া হয় এবং পরিবারের সঙ্গে অস্থায়ী বাসায় পুনর্বাসন শুরু হয়।

শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মালালার মানসিক দৃঢ়তা ও জীবনের প্রতি অদম্য ইচ্ছাশক্তি তার দ্রুত সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ সময় ফিজিওথেরাপি ও মানসিক পরামর্শের মাধ্যমে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। চিকিৎসকরা বলেন, সময়মতো চিকিৎসা এবং মালালার শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে তিনি মৃত্যুর আগেই জীবন ফিরে পেয়েছেন।

এতদূর আসার পরও মালালা থেমে যাননি। বরং তিনি আরও দৃঢ় হয়ে নারী শিক্ষার অধিকার ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্বব্যাপী কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং বিশ্বের অন্যতম কনিষ্ঠ নোবেলজয়ী হিসেবে পরিচিত হন। মালালা নিজেও বলেছেন, গুলিবিদ্ধ হওয়া ঘটনা তাকে আরও দৃঢ় ও সাহসী করেছে।

মালালার জীবন শুধুমাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নয়, মানব জীবনের অদম্য ইচ্ছাশক্তির উদাহরণ হিসেবেও বিশ্ববাসীর জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

শেয়ার করুন