বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সিরাজগঞ্জ হানাদারমুক্ত দিবস আজ : ৫৪ বছরের স্মৃতিতে গৌরব ও বেদনার আবেশ

জলিলুর রহমান জনি, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
সিরাজগঞ্জ হানাদারমুক্ত দিবস আজ (১৪ ডিসেম্বর)। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ শহর। পতপত করে ওড়েছিল স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজের পতাকা। অর্ধশতাধিক মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগে অর্জিত এ বিজয়ের দিনটি সিরাজগঞ্জবাসীর ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়।
মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুই দিন পূর্বে, ১৪ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে হাজারো মুক্তিযোদ্ধা তিন দিক থেকে সমন্বিত আক্রমণে সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নেন। শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উল্লাস, ফাঁকা গুলিতে প্রতিধ্বনিত হয় বিজয়ের সুর। কৃষক-শ্রমিকসহ হাজার হাজার সাধারণ মানুষ জাতীয় পতাকা হাতে শহরমুখী হন। একই দিনে পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসও।
বুধবার সকালে ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম বলেন, “৯ ডিসেম্বর খোকশাবাড়ীর শৈলাবাড়ী ক্যাম্পে আমাদের প্রথম আক্রমণ হয়। সেদিন শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাহমুদ। পরবর্তী কয়েক দিন তীব্র লড়াইয়ের পর ১৩ ডিসেম্বর আমরা তিনদিক থেকে শহর মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিই। রাতভর প্রচণ্ড যুদ্ধের পর হানাদাররা ট্রেনে পালিয়ে যায়।”
১৪ ডিসেম্বর ভোরে ওয়াপদা অফিসে হানাদার বাহিনীর মূল ঘাঁটি দখলে নেয় মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর কওমি জুটমিল, মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনায় উড়ানো হয় জাতীয় পতাকা। পুরোপুরি হানাদারমুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। মুক্ত শহরের প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইসমাইল হোসেনকে এবং সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের সর্বাধিনায়ক করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আমির হোসেন ভুলুকে।
চারদিনব্যাপী (৯, ১১, ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর) ভয়াবহ যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন ইঞ্জিনিয়ার আহসান হাবিব কালু ও সুলতান মাহমুদসহ অন্তত ছয় বীরযোদ্ধা। এ ছাড়া যুদ্ধ চলাকালে জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও অর্ধশতাধিক মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ উৎসর্গ করেন।
এর আগে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি সেনারা সিরাজগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে ক্যাম্প স্থাপন করে শুরু করে ধরপাকড়, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতন। শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞ। ভদ্রঘাট, বাঘাবাড়ী, বরইতলা, বাগবাটি, ঘাটিনা ব্রিজ, শৈলাবাড়ী, ব্রহ্মগাছাসহ বিভিন্ন স্থানে হয় টানা গেরিলা যুদ্ধ।
এ দিনটিকে ঘিরে জেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন পৃথক কর্মসূচি পালন করছে। শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
৫৪ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধাদের সেই আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাঁথা সিরাজগঞ্জবাসীর হৃদয়ে আজও অম্লান—এই দিন তাই গৌরবের, স্মৃতির ও শোকের এক অনন্য সমাহার।
শেয়ার করুন