সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১০ লাখের বেশি আবেদন, মাত্র ৩ লাখই ভর্তির সুযোগ পেয়েছে

দেশের সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে আবেদন করেছেন মোট ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪ জন শিক্ষার্থী। ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে প্রথম তালিকায় নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৩ লাখ ৫ হাজার ৪৯৯ জন। এর বিপরীতে, পছন্দের স্কুলে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৫৫৫ জন।

বিদ্যালয়গুলোর ভর্তিযোগ্য ১১ লাখ ৯৩ হাজার ২৮১টি আসনের মধ্যে ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৭৮২টি আসন শূন্যই থেকে যাচ্ছে। ভর্তি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনেক স্কুলে একটিও আবেদন জমা পড়েনি। আবার কিছু নির্বাচিত স্কুলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের আগ্রহ বেশি হওয়ায় সেখানে আসন ফাঁকা থাকলেও অন্য স্কুলের জন্য আবেদন কম ছিল। ফলে সেসব স্কুলের আসনও শূন্য থেকে যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ডিজিটাল লটারির কার্যক্রম শুরু হয়। সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষার্থী বাছাই করা হয়। লটারির টেকনিক্যাল বা কারিগরি কাজ চলে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে দুপুর ২টার কিছু সময় পরে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, সরকারি স্কুলে প্রথম তালিকায় নির্বাচিত হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৫২১ জন শিক্ষার্থী। বেসরকারি স্কুলে শূন্য আসন ছিল ১০ লাখ ৭২ হাজার ২৫১টি। এর বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৬ জন শিক্ষার্থী। লটারিতে নির্বাচিত হয়েছেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৭৮ জন। এর ফলে বেসরকারি স্কুলে ৮ লাখ ৭৪ হাজার ২৭৩টি আসন শূন্য থেকে যাবে।

ফলাফলের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভর্তির জন্য আবেদনকারী ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৩ লাখ ৫ হাজার ৪৯৯ জনই ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার ৫৫৫ জন পছন্দের কোনো স্কুলে জায়গা পাননি।

সরকারি স্কুলে শূন্য আসন ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৩০টি। আবেদন করেছিলেন ৭ লাখ ১৯ হাজার ৮৫৪ জন। নির্বাচিত হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৫২১ জন। ফলে সরকারি স্কুলে ১৩ হাজার ৫০৯টি আসন ফাঁকা থাকবে। বেসরকারি স্কুলে শূন্য আসন ছিল ১০ লাখ ৭২ হাজার ২৫১টি। আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৬ জন। নির্বাচিত হয়েছেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৭৮ জন। ফলে বেসরকারি স্কুলে ৮ লাখ ৭৪ হাজার ২৭৩টি আসন ফাঁকা থাকবে।

ভর্তি না পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মাউশির কর্মকর্তারা জানান, আবেদনকালে শিক্ষার্থীরা সর্বাধিক পাঁচটি স্কুল পছন্দ করতে পারতেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থী একটি বা দুটি স্কুলের নাম দিয়েছেন, যাতে প্রিয় স্কুলে ভর্তির সম্ভাবনা থাকে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা যদি পছন্দের স্কুলে না পড়ে, তাহলে তারা পূর্ববর্তী স্কুলেই থাকবে। এর ফলে কিছু স্কুলে আসন ফাঁকা থাকলেও শিক্ষার্থীরা ভর্তি হননি।

মাউশির মাধ্যমিক উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘‘কিছু স্কুলে শিক্ষার্থীদের ঝোঁক অত্যাধিক। সরকারি স্কুলে অনেকগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। বেসরকারি স্কুলের ক্ষেত্রে সীমিত কিছু বিদ্যালয়ে আবেদন বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার ভিকারুননিসা ও মতিঝিল আইডিয়ালের কিছু শ্রেণিতে শূন্য আসন ছিল ৫৫টি। সেখানে আবেদন পড়েছে ২০ হাজার এবং অধিকাংশই শুধু সেই স্কুলের নাম পছন্দ তালিকায় রেখেছে। ফলে ৫৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, বাকি ১৯ হাজার ৪৫ জন অন্য কোনো স্কুল পায়নি।’’

তিনি বলেন, ‘‘ধারণা করা হচ্ছে, এই শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই কোনো স্কুলে ভর্তি আছে। এজন্য তারা একটি প্রিয় স্কুল নির্বাচন করেছেন। তাই লটারিতে নাম না এলে সম্পূর্ণ স্কুলের সুযোগ হারাচ্ছেন না। এছাড়া দ্বিতীয় তালিকায় নতুনদের জন্য সুযোগ থাকবে।’’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী প্রধান রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘‘শিক্ষায় বৈষম্য কমাতে লটারির মাধ্যমে কিছুটা সমাধান হয়েছে। আগে আর্থিকভাবে অসচ্ছল বাবা-মা পছন্দের স্কুলে সন্তান ভর্তি করাতে সাহস পাননি। এখন লটারির মাধ্যমে সুযোগ পেলে বড় বড় স্কুলেও ভর্তি হচ্ছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আগের সময়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হতো। এতে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থী বাদ পড়ত। এক স্কুলে শুধুই ভালো শিক্ষার্থী, অন্যে স্কুলে পিছিয়ে থাকা। এখন লটারির কারণে এমন বৈষম্য কমেছে।’’

রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘‘বর্তমান লটারিতেও কিছু ত্রুটি আছে। আলোচনা করে পদ্ধতিটি আরও গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ করা সম্ভব। এতে ভর্তিপরীক্ষার নামে বাণিজ্য বন্ধ হবে। নার্সারি থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত যেসব স্কুলে টাকার খেলা চলেছে, তা কমবে।’’

শেয়ার করুন