শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে: জিইডি

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫’ প্রতিবেদনে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার (৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবেদনের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পূর্বাভাসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বর্তমানে প্রধান সূচকগুলো ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জিইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হবে বলে বড় উন্নয়ন সহযোগীরা ধারণা করছেন। বিশ্বব্যাংক ৩.৩ থেকে ৪.১ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৩.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে ২০২৬ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি পুনরায় গতি পাবে এবং প্রবৃদ্ধি ৫.১ থেকে ৫.৩ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেদনে দেশের বহিঃখাতের স্থিতিশীলতা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি স্থিতিশীলতা এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির পুনরুদ্ধার অভ্যন্তরীণ চাহিদি বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনছে। রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে নীতি মেনে চলা ও বাজার বহুমুখীকরণের মাধ্যমে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও স্থিতিশীল রয়েছে এবং এটি তিন মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম, যা বিচক্ষণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুই বিভাগে ভাগ করার কারণে জুন মাসে রাজস্ব সংগ্রহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। তবে পরে কর্মসূচি প্রত্যাহার ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় রাজস্ব আদায় পুনরায় শুরু হয়।

জিইডি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির জন্য মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। যদিও সূচকগুলো পুনরুদ্ধারের দিকেই ইঙ্গিত করছে, তবুও প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস এবং জীবনমান উন্নয়নে রূপান্তরিত হবে কি না তা নির্ভর করছে কার্যকর নীতি, শক্তিশালী আর্থিক শাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশলের ওপর।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রম এখনও প্রবৃদ্ধির বড় বাধা। বিপরীতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি কার্যকারিতা এবং উৎপাদন খাতের আউটপুট বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে এবং ২০২৬ অর্থবছরেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

যাইহোক, সীমিত রিজার্ভ, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, ক্রেতাদের পরিবর্তিত পছন্দ, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বৃহৎ ও ক্রমবর্ধমান শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পোশাক ও এসএমই খাতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের অস্থিরতা, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ, সুশাসন সংকট ও বৈদেশিক ঝুঁকি সমাধান ব্যর্থ হলে প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে, জীবনমান খারাপ হতে পারে এবং বৈষম্য বাড়তে পারে। অন্যদিকে, সময়োপযোগী ও সমন্বিত নীতি সংস্কার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং স্পষ্ট নীতিগত বার্তা প্রদান করলে বাংলাদেশ পুনরায় গতি পাবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।

জিইডি উপসংহারে উল্লেখ করেছে, কাঠামোগত সংস্কার ও উদ্ভাবন-নির্ভর অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা সমর্থিত একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশল ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে পরিচালিত করবে, যা দেশের স্থিতিস্থাপকতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করবে।

শেয়ার করুন