ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফরের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ক্যাজুয়ালিটি বিভাগের ইনচার্জ ডা. ধনদেব চন্দ্র বর্মণকে সাময়িকভাবে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। যদিও রোববার বিকাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তার বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়নি।
তবে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. গোলাম ফেরদৌস বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ডিজির সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে ওই চিকিৎসককে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. ধনদেব চন্দ্র বর্মণ জানান, ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে তিনি ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এই সময়কালে জরুরি বিভাগে রোগী, স্বজন কিংবা স্টাফদের কারও সঙ্গে বড় ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি বলে দাবি তার। ভাঙচুর, মারামারি কিংবা শৃঙ্খলাবিরোধী কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, তিনি হাসপাতালের পরিচালক, সহকারী পরিচালক ও ডেপুটি ডিরেক্টরের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং বিভাগের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছিল। তবে পরিদর্শনের দিন তিনি আশা করেছিলেন, মহাপরিচালক একজন অভিভাবকের মতো সমস্যাগুলো জানবেন এবং সমাধানের দিকনির্দেশনা দেবেন। কিন্তু তার অভিযোগ, বাস্তবে সেটি হয়নি।
ডা. ধনদেবের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজি হাসপাতালে এসে জরুরি বিভাগে কেন টেবিল এভাবে রাখা, কেন কিছু সরঞ্জাম নেই—এসব বিষয় নিয়ে সবার সামনে তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। এমনকি তিনি তিনবার নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও ডিজি নানা ভাবে তাকে হেয় করেছেন বলে অভিযোগ করেন ওই চিকিৎসক।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তার চাকরির বয়স প্রায় শেষের দিকে। আর মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনি পিআরএলে যাবেন। অথচ এই সময়ে এসে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ২০১৩ সালে তিনি এমএস ডিগ্রি অর্জন করলেও দীর্ঘদিন পর ২০২৫ সালে তাকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি জেনারেল সার্জারির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখনো হাসপাতালের ভেতরে অপারেশন করার সুযোগ পাননি। এর জন্য সরাসরি কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন তিনি।
জনবল সংকট ও দায়িত্ব বণ্টনের বৈষম্যের কথাও তুলে ধরেন ডা. ধনদেব। তিনি বলেন, গাইনি বিভাগের চিকিৎসককে জেনারেল বিভাগে কাজ করানো হচ্ছে। এতে করে সঠিক জায়গায় সঠিক জনবল ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তার ভাষায়, পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাই যেন ‘একটা উদ্ভট উটের পিঠে চলছে’।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাব-সেন্টার থেকে শুরু করে বড় হাসপাতাল পর্যন্ত সর্বত্র অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম রয়েছে। নানা ধরনের দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার কারণে তিনি মানসিকভাবে এতটাই ক্লান্ত যে সরকারি পেশাতেই আর আগ্রহ অনুভব করছেন না। এমনকি তিনি নিজেই সাসপেনশন চান বলেও মন্তব্য করেন।
আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, রাত ৩টা বা ৪টায় ডাক পড়লেও তিনি ছুটে আসেন, দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। অথচ এসব কাজের কোনো মূল্যায়ন হয় না। অথচ প্রশাসন বায়োমেট্রিক উপস্থিতি নিয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ডা. ধনদেব আরও বলেন, তার বন্ধুদের অনেকেই আজ বিভিন্ন জায়গায় অধ্যাপক হয়েছেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ ও পোস্টিং–সংক্রান্ত জটিলতায় তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। ট্রেনিং পোস্ট পেতে তাকে রাজনৈতিক যোগাযোগের কথা শুনতে হয়েছে—এমন অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি দাবি করেন, স্বাস্থ্য খাতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজনের সময় রাজনীতিকরা হাসপাতালের খোঁজ নেন, কিন্তু সংকট দূর করার বাস্তব উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। এসব কারণে তিনি হতাশ ও বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছেন বলে জানান।
জানা গেছে, শনিবার সকালে শিশুদের মূত্রাশয় ও প্রজননতন্ত্রজনিত রোগের চিকিৎসা বিষয়ক এক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর।
সেমিনারে যোগদানের আগে তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি জরুরি বিভাগের ব্যবস্থাপনা, রোগী সেবা, চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও সামগ্রিক সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এই পরিদর্শনের সময় ক্যাজুয়ালিটি ইনচার্জ ডা. ধনদেব বর্মণ জরুরি বিভাগের সীমাবদ্ধতা, জনবল ঘাটতি এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার কথাবার্তার ভাষা ডিজির কাছে আপত্তিকর মনে হওয়ায় উভয়ের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয়।
একপর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. ধনদেবকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কারের নির্দেশ দেন। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. গোলাম ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, সাধারণত ডা. ধনদেব শান্ত স্বভাবের মানুষ। ডিজির সঙ্গে এ ধরনের উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত। ঘটনার পর তাঁকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং অসদাচরণের অভিযোগে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।





