সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নের পূর্ব মানিকপুর গ্রামের ব্যবসায়ী ও প্রবাসফেরত নুমান উদ্দিন হত্যার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনো মূল রহস্য উদঘাটন কিংবা প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারেনি। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয় জনগণ। তাঁদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে গুম করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে নুমান উদ্দিনকে, অথচ শুরু থেকেই পুলিশ গাফিলতি করছে।
নুমান উদ্দিন প্রায় ৩০ বছর প্রবাসে থাকার পর ২০২১ সালে দেশে ফিরে কালীগঞ্জ বাজারে সুপারি ব্যবসা শুরু করেন। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে দোকানে গিয়ে আর ফেরেননি তিনি। পরদিন স্ত্রী মনওয়ারা বেগম ও শ্যালক হানিফ উদ্দিন সুমন জকিগঞ্জ থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। ১ অক্টোবর বিকেলে শয়লা স্মৃতি হাসপাতালের পাশের ধানক্ষেতে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।
পরিবার অভিযোগ করে, নিখোঁজের পরদিনই একটি মোবাইল নম্বর থেকে মুক্তিপণের জন্য এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানো হলেও ওসি জহিরুল ইসলাম মুন্না তা গুরুত্ব না দিয়ে প্রতারণা বলে মন্তব্য করেন।
নুমানের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নী ৩ অক্টোবর জকিগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর মনওয়ারা বেগম আদালতে রিয়াজ উদ্দিনসহ ৭ জনকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নম্বর: ১৪৯/২০২৫)। পাল্টা হিসেবে রিয়াজ উদ্দিনও মনওয়ারা বেগম, তার মেয়ে ও শ্যালককে আসামি করে আরেকটি মামলা করেন (মামলা নম্বর: ১৬৬)। এতে দুই দিকেই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
নুমান হত্যার পরপরই জানাজা থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ হাজারো মানুষ মানববন্ধন ও মশাল মিছিলে অংশ নেন। দ্রুত বিচার ও আসামিদের গ্রেফতারের দাবিতে তারা ঐক্যবদ্ধ হন।
নিহতের পরিবার জানায়, “যখন মানুষ মশাল মিছিল করছিল, তখন আমরা ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, মিছিলে আসামিও আছে। তার মানে তিনি সনাক্ত করতে পেরেছেন, কিন্তু এখনও গ্রেফতার করছেন না। কেন?”
এদিকে নিহতের শ্যালক হানিফ উদ্দিন সুমনকে গ্রেফতার করে পুলিশ তিন দিনের রিমান্ডে নেয়। তবে দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মামলায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
পরিবারের দাবি, প্রকৃত খুনিদের আড়াল করে বিভ্রান্তিমূলক দিক নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে নিহতের স্ত্রী মনওয়ারা বেগম, মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নী, ছোট মেয়ে সামিয়া জান্নাত তান্নী ও বোন লিলা বেগম অভিযোগ করেন, তারা ফেসবুক, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রতিনিয়ত হুমকি পাচ্ছেন।
সামিয়া জান্নাত তান্নী বলেন, “একদিন এক বৃদ্ধ লোক বাড়িতে এসে আমাকে দিয়ে স্বীকার করানোর চেষ্টা করেন যে, আমার মা, মামা ও বোন আমার বাবাকে হত্যা করেছেন। তিনি বলেন, স্বীকার করলে মামলায় নাম কাটা যাবে। আমি গোপনে তার ছবি তুলে রাখি।”
তারা আরও বলেন, ওসি জহিরুল ইসলাম মুন্না মেসেজে মুন্নীকে সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলতে বলেন। সেই হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওসি এটিকে ‘এআই তৈরি’ দাবি করলেও, সেই চ্যাট এখনো হোয়াটসঅ্যাপে রয়েছে।
জকিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম মুন্না মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে রিসিভ করেননি। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল্লাহ আল মুমিন বলেন, “ কয়েকজন আমাদের টার্গেটের মধ্যে আছে। তাদের না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে কোনো গাফিলতি নেই, চেষ্টা চলছে।”
নিহতের স্ত্রী মনওয়ারা বেগম বলেন, “ইদ্দতকালীন সময় হওয়ায় এতদিন সাংবাদিকদের সামনে আসিনি। এখন আমি দেশবাসী ও সরকারের সহযোগিতা চাই—আমার স্বামীর হত্যার সঠিক তদন্ত হোক, প্রকৃত খুনিরা যেন আইনের আওতায় আসে।”
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানসহ গোয়েন্দা সংস্থা, সাংবাদিক সমাজ ও দেশের সকল মানুষের সহযোগিতা কামনা করে বলা হয়, “এভাবে যদি হত্যাকারীরা আড়ালেই থাকে, তাহলে ন্যায়বিচার বলে কিছু থাকবে না।”
তারা আরও বলেন, “মানুষ যখন মশাল হাতে বিচারের দাবি করছে, তখন পুলিশ নিশ্চুপ—এটা মেনে নেওয়া যায় না। প্রকৃত অপরাধীদের যেন দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয় এবং তদন্তে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া হয়।”





