বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কীটনাশকের ঝুঁকি মোকাবেলায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

আজ (২৬ নভেম্বর ২০২৫) বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আয়োজিত “কীটনাশকের ঝুঁকি মোকাবেলায় আইনের সঠিক প্রয়োগ” শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কীটনাশক ব্যবহার হ্রাস ও নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিজমি সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে স্থানীয় কৃষক, কৃষিবিদ, কীটনাশক বাজারজাতকারী ও বিপণনকারীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সকাল ১০:৩০টায় আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আব্দুর রহিম।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেলার রিসার্চ, অ্যাডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন কো-অর্ডিনেটর রহমুনা নূরাইন। তার আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্র। কৃষি নির্ভর এই দেশের শ্রমশক্তির ৪১ শতাংশ এখনও কৃষিতে নিয়োজিত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণায় দেখা গেছে, অকৃষি কাজের জন্য প্রতি বছর ০.৬৮৫ শতাংশ হারে আবাদি জমি কমছে। অতিরিক্ত উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত রসায়নিক সার ও কীটনাশকের কারণে ক্রমশ কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে দেশে মাত্র ৮ হাজার টন কীটনাশক ব্যবহৃত হতো, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ৪০ হাজার টনে পৌঁছেছে। দেশে ৩৭৭টি কীটনাশক বাজারজাতকরণের জন্য নিবন্ধনকৃত, যেগুলোর সবই বিপজ্জনক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত ২৫টি বালাইনাশক বিপজ্জনক হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।

রাসায়নিক কীটনাশক পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এর ব্যবহারে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মাটি, পানি ও বাতাস দূষিত হচ্ছে। পোকামাকড়ের মৃত্যু জীববৈচিত্র্য হ্রাস করছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে; পারকিনসন রোগ, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও স্নায়বিক দুর্বলতা থেকেও ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশে বালাইনাশক আইন ২০১৮, জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮, জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি ২০২০ ও জাতীয় জৈব কৃষি নীতি ২০১৬ থাকা সত্ত্বেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।

রাজশাহী, দিনাজপুর ও ফরিদপুরে গত তিন মাসে ধানক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগে তিনজন কৃষক নিহত হয়েছেন। প্রাকৃতিক কৃষির সমন্বয়কারী দেলোয়ার জাহান মন্তব্য করেন, “এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি কৃষক হত্যা।” তার মতে, কৃষক ও কৃষিকাজে যুক্তদের রোগবালাই বেড়ে চলেছে; পাশাপাশি ভোক্তাদের মধ্যে রোগপ্রবণতাও বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি শস্য ও সবজি চাষে কীটনাশক প্রয়োগের নির্দিষ্ট শিডিউল কৃষকদের অতিরিক্ত ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছে। ‘কীটনাশক’ শব্দের পরিবর্তে ‘কীটদূরীকরণ’ ব্যবহার করা উচিত, কারণ কীট-পতঙ্গ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।

আলোচনায় দেশি বীজ, বৈচিত্র্যময় চাষাবাদ, মিশ্র কৃষি পদ্ধতি এবং ব্যাঙ, পাখি, শকুনসহ প্রাকৃতিক কীটদূরীকরণকারীদের রক্ষা করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বার্সিক পরিচালক পাভেল পার্থ বলেন, “বাংলাদেশে কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার অংশ।” তিনি বলেন, “সবুজ বিপ্লব ও জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ফসলের প্রচার, বায়োক্রপসায়েন্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর জলবায়ু সম্মেলনে অর্থায়ন উদ্বেগজনক। এ প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জৈব অস্ত্র ব্যবহারের দায়ে চিহ্নিত।”

তিনি উল্লেখ করেন, এনডিসিতে প্রথমবারের মতো এগ্রোইকোলজির প্রতিশ্রুতি এসেছে। এটি বাস্তবায়নে কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ, আন্তঃমন্ত্রণালয় ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয় জরুরি।

সিনজেনটার সিনিয়র এক্সিকিউটিভ তাহেরুল ইসলাম বলেন, “পণ্যের লেবেল, সচেতনতামূলক প্রচারণা, কৃষক প্রশিক্ষণ ও সঠিক স্প্রে প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।”


ইনতেফা কোম্পানির প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হানিফ উদ্দিন বলেন, “কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়ম মেনে ব্যবসা করি। বাজারে অনিবন্ধিত কীটনাশকের বিক্রি বন্ধে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।”

ক্যাব সভাপতি ও সাবেক সচিব সফিকুজ্জামান বলেন, “১৮ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার টনের কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।”

প্রান্তিক কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, “বিষমুক্ত কৃষিতে যাওয়ার জন্য কৃষকদের বহুমুখী প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।” প্রান্তিক কৃষক আবদুস সামাদ বলেন, “সচেতন হয়ে দেশি জাতের ধানসহ বিভিন্ন ফসল রোপণ করি এবং অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করি।” গাজীপুরের কৃষক কামাল সরকার জানান, “বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগ না হলেও আংশিকভাবে অনুসরণ করছি।”

বারির সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নাজিমউদ্দিন বলেন, “কীটনাশক ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনগতভাবে এগোতে হবে। ২০১২ সালের আইনের ২২(ক) ধারা অনুযায়ী হ্যান্ডলারদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক, কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেসি না থাকায় মনিটরিং কার্যকর হচ্ছে না।” তিনি আরও জানান, “ডাক্তাররা রোগের তথ্য যথাযথভাবে রাখেন না। অনেক কোম্পানি বিপজ্জনক কীটনাশক ‘সবুজ মার্ক’ করে বিক্রি করছে। নিষিদ্ধ বালাইনাশক যেমন গ্লাইফোসেট এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে।”

সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. আতাউর রহমান বলেন, “ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোন ও কীটনাশক কখনও জরুরি হতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও তথ্য প্রচারে মনোযোগ বাড়াতে হবে।”


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রভাতচন্দ্র বর্মণ বলেন, “কীটনাশকের মান, ডোজ ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে তিন ধরনের টেস্ট করা হয়। কৃষকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে ওয়েবসাইটে প্রতিনিধিরা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত।”


বারির কীটতত্ত্ব বিভাগের ড. নির্মল কুমার দত্ত বলেন, “কীটনাশক রাতারাতি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। ব্যবহার কমাতে নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও কৃষক পর্যায়ে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। পরিবেশবান্ধব কীটনাশক দামি হওয়ায় কৃষকের নাগালের বাইরে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. সেকেন্দার ইসলাম জানান, “কীটনাশক ঝুঁকিপূর্ণ। তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। ধীরে ধীরে এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”

প্রধান অতিথি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আব্দুর রহিম বলেন, “ফলন বাড়ানোর তাড়নায় রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও উচ্চফলনশীল জাত ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। এখন টেকসই কৃষি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে। জৈব ও অজৈব কৃষির সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।”

তিনি যোগ করেন, “রাসায়নিক কীটনাশকের কারণে পোকামাকড়ের রেজিস্ট্যান্স বাড়ছে, প্রয়োগের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাকৃতিক পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণের ম্যাজিস্ট্রেসি না থাকায় মাঠে আইন প্রয়োগে সমস্যা হচ্ছে। কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে অ্যাপস ব্যবহার করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় খাদ্য সরবরাহ কঠিন। লিজের ওপর চাষাবাদে চাপ এবং অসংগত মূল্য কাঠামো জমির উর্বরতা নষ্ট করছে। ক্রপ ডাইভার্সিটিতে গুরুত্ব দিতে হবে।”

আলোচকরা বলেন, কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু মানুষের স্বাস্থ্যে নয়, মাটির উর্বরতা, জীববৈচিত্র্য এবং ফসলের গুণমানেও নেতিবাচক। নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পেলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব।

মতবিনিময়ে সভাপতিত্ব করেন বেলার হেড অব প্রোগ্রামস ফিরোজুল ইসলাম মিলন এবং সঞ্চালক ছিলেন এএমএম মামুন, প্রোগ্রাম ও ফিল্ড কোঅর্ডিনেটর, বেলা।

শেয়ার করুন