শনিবার, ২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নদীর টানে জেলেদের উৎসব যমুনার বুকজুড়ে রুই, কাতলা ও বোয়ালের সমারোহ

জলিলুর রহমান জনি, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
যমুনার পানি কমতে না কমতেই নদীর বুকজুড়ে যেন উৎসব শুরু হয়েছে জেলেদের। সারা রাত জাল পেতে ভোরের আলো ফুটতেই তারা ফিরছেন নৌকাভর্তি মাছ নিয়ে। ছোট-বড় নানা প্রজাতির সুস্বাদু মাছ ধরা পড়ছে জেলেদের জালে। আর এসব মাছ চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ফলে নদীকেন্দ্রিক জীবিকা নির্ভর জেলে পরিবারের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।
ভোরের বাজারে দেখা যায়, ঘাটে নৌকা ভিড়তেই ডাক পড়ে যায় মাছের। পাইকাররা অপেক্ষায় থাকেন কে আগে কিনবেন সেই প্রতিযোগিতায়। রুই, কাতলা, আইড়, গুজি, বোয়াল, বাঘাইড়, পঙ্গাশ যমুনার এসব মাছের আকর্ষণ সবসময়ই বেশি। দামও তাই বেশ চড়া।
সিরাজগঞ্জ শহরের বাজারে রুই-কাতলা প্রতি কেজি ১২০০ টাকা, অন্য মাছের দাম ১২০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে। ছোট মাছের বাজারেও উর্ধ্বমুখী দাম বাতাসি ১৬০০, বাঁশপাতা ১৫-১৬০০ টাকা কেজি, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে বলেই অভিযোগ ক্রেতাদের।
মেঘাই ঘাট থেকে মাছ বিক্রি করতে আসা জেলে রহিম জানান, “সারা রাত মাছ ধরে সকালে বাজারে আসলাম। দুইটা বড় বোয়াল এনেছি একটা ৫ কেজি, আরেকটা সাড়ে ৪ কেজি। ঘাটে আনার সঙ্গে সঙ্গেই ডাক পড়ে যায়। মাছ বিক্রি করতে কোনো কষ্ট হয় না।”
ক্রেতাদের মাঝেও যমুনার মাছ নিয়ে আলাদা আগ্রহ দেখা যায়। স্থানীয় ক্রেতা হোসেন আলী বলেন, “যমুনার মাছের স্বাদই আলাদা। তাই ১২শ টাকা কেজি কাতলা নিলাম।” ঢাকায় বসবাসকারী শাহিনুর বেগম বলেন, “দেশে এলেই যমুনার মাছ কিনি। আজকে ১৬শ টাকা কেজি বাঘাইড় নিলাম।”
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বছরে মোট ৭৮৮৯২.৭৮ টন মাছের উৎপাদন হয়। এর মধ্যে প্রাকৃতিক উৎস থেকে আসে ৪০৭০১.৬৮ টন এবং চাষকৃত মাছ ৩৮১৯১.১ টন। স্থায়ী মৎস্যজীবীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৯৭৩ জন, মৌসুমী জেলে প্রায় ৪-৫ হাজার।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, “মা মাছ সংরক্ষণ ও নিষেধাজ্ঞা পালনের কারণে যমুনায় মাছের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। মাছেরও বৃদ্ধি আশাতীত হয়েছে। পানি কমতেই জেলেরা প্রচুর মাছ ধরতে পারছেন। এতে তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।”
যমুনা পাড়ের মানুষের জীবনে নদী যেন আশীর্বাদস্বরূপ। কেউ সারারাত আবার কেউ দিনভর জাল ফেলছেন। বড়শি, বিভিন্ন ধরনের জাল—মাছ ধরার যন্ত্রও বদলে যায় মাছের ধরন অনুযায়ী। নদীর সঙ্গে দিনযাপনের এই লড়াই আজ অনেক জেলে পরিবারকে সচ্ছলতার পথে ফিরিয়ে এনেছে।
যমুনার পানি কমার সঙ্গে জীবনের স্রোত যেন জেগে উঠেছে নদী তীরের জনপদে। মাছের প্রাচুর্য জেলেদের শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, এনে দিয়েছে নতুন আশা—নদীর প্রতি বিশ্বাস আবারও দৃঢ় হয়েছে। যমুনা তাই শুধু নদী নয়, নদী পাড়ের মানুষের জীবনের ভরসা, জীবিকার দোলনা।
শেয়ার করুন