শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সিয়েরা লিওনে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর জুজু বাণিজ্যের নৃশংস চক্র

সিয়েরা লিওনের অধিকাংশ পরিবারই তাদের সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে থাকে। কারণ সেখানে কথিত ‘জুজু’ বা জাদুটোনার নামে মানব অঙ্গপাচার এবং আচারঘটিত হত্যাকাণ্ড বহুদিন ধরেই ভয়ংকর বাস্তবতা। এই অন্ধকার জগতের শিকার হয়েছে ১১ বছরের শিশু পাপায়োও। চার বছর আগে বাজারে গিয়ে আর ফিরেনি সে; কূপ থেকে মিলেছিল তার বিকৃত মরদেহ—এক চোখ, এক হাতসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহীন।

পাপায়োর মা সালায় কালোকো আজও ন্যায়বিচার পাননি। তিনি বলেন, “আমার সন্তানকে কে হত্যা করেছে, কেউ জানে না—সবাই চুপ।” সিয়েরা লিওনে এ ধরনের ঘটনা এতটাই ঘনঘন যে পরিবারের সবাইকে বারবার সতর্ক করে রাখতে হয়।

জাদুটোনা ও অঙ্গপাচারের ভয়াবহতা

 

সিয়েরা লিওনে কিছু চক্র মানুষের অঙ্গ ব্যবহার করে তথাকথিত জাদু বা তাবিজ-কবজ বানায়। ক্ষমতা, অর্থ বা প্রভাব পেতে অনেকেই গোপনে এসব জুজু চর্চাকারীর শরণাপন্ন হয়। এই বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, বরং রয়েছে চরম অমানবিকতা।

সমস্যাটি আরও গুরুতর কারণ—৮৯ লাখ মানুষের দেশে আছেন মাত্র একজন প্যাথলজিস্ট। ফলে হত্যার প্রমাণ সংগ্রহ বা তদন্ত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ওপর সমাজ ও প্রশাসনের ভেতরেও জাদুটোনার প্রতি ভয় কাজ করে, অনেকেই মামলা বা তদন্তে এগোতে সাহস পান না।

বিবিসির গোপন তদন্ত

বিবিসি আফ্রিকা আই দুইজন জুজু প্র্যাকটিশনারের সন্ধান পেয়েছে যারা গর্ব করে জানিয়েছে যে তারা মানব অঙ্গ সংগ্রহ করতে পারে। একজন দাবি করে তার ক্লায়েন্ট পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের “বড় রাজনীতিবিদ”—নির্বাচনের সময় যাদের ভিড় বেড়ে যায়।

বিবিসির একজন সাংবাদিক ‘ওসমান’ নামের পরিচয়ে ছদ্মবেশে তদন্তে নেমে কানু নামের এক জুজু কারিগরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ঘন জঙ্গলের ভিতরে গোপন আস্তানায় কানু জানায়, নারী দেহের নির্দিষ্ট অঙ্গের জন্য দাম ৭০ মিলিয়ন লিওন (প্রায় তিন হাজার ডলার)। প্রমাণের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বিবিসি আর এগোয়নি, বরং সংগৃহীত প্রমাণ পুলিশকে দেয়।

হারবালিস্টদের বদনাম বাড়ছে

জুজু চর্চাকারীরা নিজেদের হারবালিস্ট পরিচয় দিয়ে সাধারণ ভেষজ চিকিৎসকদেরও সন্দেহের মুখে ফেলছে। অথচ দেশের মানুষ মূলত ভেষজ চিকিৎসার ওপরই নির্ভরশীল।

সিয়েরা লিওনের ট্র্যাডিশনাল হিলারস কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট শেকু তারাওয়ালি বলেন, “আমরা চিকিৎসক, হত্যাকারী নই। এসব অপরাধীরা আমাদের সুনাম নষ্ট করছে।”

পুলিশ অভিযানে যা পাওয়া গেল

দ্বিতীয় এক অপরাধী ইদারাকে ফ্রিটাউনের উপশহর ওয়াটারলু থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার বাড়ি থেকে মানুষের অঙ্গসদৃশ জিনিস উদ্ধার হয়। তবে পরে সবাই জামিনে বেরিয়ে আসে। কানু নামের মূল সন্দেহভাজনকে আর খুঁজে পায়নি পুলিশ।

উচ্চশিক্ষিতরাও শিকার

এই অপরাধ কেবল দরিদ্র শ্রেণিকে টার্গেট করে না। এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককেও একইভাবে হত্যা করা হয়; তার দেহ উদ্ধার হয় এক হারবালিস্টের মন্দির থেকে। মামলা আদালতে গিয়েও আর অগ্রগতি হয়নি।

বিবিসি প্রতিবেদকের পরিবারের এক সদস্য ফাতমাতা কনটেকেও হত্যার শিকার হতে হয়। সন্দেহ—তিনিও জুজু চক্রের টার্গেটে পড়েছিলেন। তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই।

বিচারহীনতা ও ভয়—দু’য়ের মাঝেই বেঁচে থাকা

পাপায়োর পরিবারের মতো অসংখ্য পরিবার আজও অপেক্ষায় আছে ন্যায়বিচারের। সীমিত সরকারি সক্ষমতা, তদন্তের ভয়াবহ ঘাটতি, সমাজিক কুসংস্কার—সব মিলিয়ে সিয়েরা লিওনে জুজু চর্চা ও মানব অঙ্গপাচার একটি অন্ধকার, ভয়াবহ এবং অব্যাহত বাস্তবতা।

সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন