বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সমন্বিত চাষে কৃষিতে বিপ্লব; যশোরের মণিরামপুরে নতুন সম্ভাবনার জোয়ার

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর: যশোরের মণিরামপুরে কৃষি খাতে এক নীরব বিপ্লব ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে ধান ও কয়েক ধরণের মৌসুমি সবজির ওপর নির্ভরশীল কৃষকরা এখন ঝুঁকছেন বহুমুখী ফসল চাষে। একই জমিতে পাশাপাশি পেঁয়াজ, পটল, শসা, বেগুন, মরিচ, রসুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, রুট কপি—এভাবে ৮ থেকে ১২ ধরনের ফসল উৎপাদনের এই পদ্ধতি স্থানীয় কৃষকদের আয়ের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, বাজারঝুঁকি কমানো এবং কম খরচে বেশি লাভ—এই চারটি কারণ সমন্বিত চাষকে মণিরামপুরে দিনের পর দিন জনপ্রিয় করে তুলছে।
মণিরামপুর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর, এবং তাদের জীবিকার মূল উৎস মাঠের ফসল। কিন্তু সেচের ব্যয় বৃদ্ধি, জমির পরিমাণ কমে যাওয়া, বাজারের অনিশ্চয়তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ কৃষককে নতুন সমাধান খুঁজতে বাধ্য করেছে। সেই সমাধানই হচ্ছে সমন্বিত ফসল উৎপাদন পদ্ধতি—যা কৃষি খাতে এখন সাফল্যের অন্যতম উদাহরণ।
উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের দশটি ইউনিয়নে কয়েক বছর আগেও জমিতে এক মৌসুমে এক বা দুই ধরনের ফসল উৎপাদনই ছিল প্রচলিত। কিন্তু গত ২–৩ বছরে কৃষি বিভাগের তদারকি, কৃষকের সচেতনতা এবং বাজারের উচ্চ লাভের কারণে বহু কৃষক এখন একই জমিতে ৮–১০ ধরনের সবজি আবাদ করছেন। এর ফলে জমির উৎপাদনশীলতা আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সরেজমিনে মশ্বিমনগর ইউনিয়নের পারখাজুরা গ্রামে গেলে দেখা যায়—গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে সবজি চাষের ব্যস্ততা। গ্রামের কৃষক ইমদাদুল হক তার মাত্র এক বিঘা জমিতে তৈরি করেছেন বৈচিত্র্যময় ফসলের এক বিস্ময়কর ক্ষেত। পেঁয়াজের সারির মাঝ বরাবর পটল, এক পাশে বেগুন ও শসা, অন্য প্রান্তে মরিচ ও রসুন; আর মাঠের চারদিকে সারি করে লাগানো হয়েছে বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি ও রুট কপি। এক নজরে দেখে বোঝা যায়—এই একটি জমিই যেন একটি ক্ষুদ্র কৃষিপল্লী।
ইমদাদুল হক বলেন, “পেঁয়াজের বাজার ভালো। আগাম তুলে ফেলায় প্রতি মণ ১২০০ টাকার মতো দাম পেয়েছি। আর অন্যান্য সবজির ফলনও অনেক বেশি। এক ফসল চাষ করলে যতটা খরচ লাগে, এতগুলো ফসল চাষ করেও ততটাই খরচ হয়েছে, উল্টো আয় হয়েছে অনেক বেশি।” তিনি বলেন, “আগে ধান করতাম। কিন্তু ধানের দাম খরচই উঠত না। এখন পুরো জমি থেকেই আয় আসে, আর বাজারের ওঠানামা নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা থাকে না।”
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, একই জমিতে একাধিক ফসল থাকায় রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়। একই ফসল বেশি থাকলে পোকামাকড় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সমন্বিত চাষে তা কমে যায়। পাশাপাশি রাসায়নিক সারও কম লাগে, কারণ একটি ফসলের অবশিষ্ট পুষ্টি অন্য ফসল ব্যবহার করতে পারে। এতে জমির উর্বরতা দীর্ঘদিন ধরে থাকে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ হাসানুজ্জামান বলেন, “আমরা কৃষকদের ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। কোন ফসল কোন ফসলের পাশে দিলে ভালো হয়, কোন ফসলের শিকড় কেমন বিস্তার করে, কোন ফসল ছায়াপ্রিয় আর কোনটি রোদে ভালো হয়—এসব বিষয় বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। কৃষকেরা এখন বৈজ্ঞানিকভাবে সবজি উৎপাদন করছে—এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।”
তিনি আরও জানান, “চাষীরা আগে দুই ফসলের লাভে সন্তুষ্ট থাকতেন। এখন একটি জমি থেকে সারাবছর আয় হচ্ছে। নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণও বেড়েছে, ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও সক্রিয় হয়েছে।”
মনিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার বীথি বলেন, “সমন্বিত চাষ পদ্ধতি শুধু বেশি লাভ নয়, এটি একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। একটি ফসল নষ্ট হলে কৃষক সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। এখন বহু ফসল থাকায় সেই ঝুঁকি আর নেই। কৃষকেরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন, আর মণিরামপুর কৃষিতে নতুন করে আলোচনায় আসছে।”
তিনি বলেন, “এই অঞ্চলের মাটি সবজি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকের আগ্রহ, আমাদের পরামর্শ এবং সরকারি প্রণোদনার ফলে সমন্বিত চাষ আগামী দিনে বড় ধরনের কৃষি পরিবর্তন আনবে।”
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের কৃষিতে ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য সমন্বিত ও বহুমুখী ফসল উৎপাদন অপরিহার্য। দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। এই পরিস্থিতিতে একই জমিতে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। মণিরামপুরের কৃষকেরা সেই পথেই হাঁটছেন এবং অন্য অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি সফল উদাহরণ তৈরি করছেন।
এছাড়া বহুমুখী চাষে সদ্য তোলা সবজি স্থানীয় বাজার ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। এতে কৃষকেরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমছে। পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এ অঞ্চলের সবজি এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাহিদা পাচ্ছে।
গ্রামীণ অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়—সমন্বিত চাষের কারণে দারিদ্র্য কমছে, কৃষকের জীবনমান উন্নত হচ্ছে এবং গ্রামের মানুষ ক্রমে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন। ছোট জমি নিয়েও লাভবান হওয়ায় অনেক বেকার যুবক কৃষিকাজে ফিরে আসছে। নারীরাও ঘরে বসে বীজতলা তৈরি, সবজি তোলা ও বাজারজাতকরণে যুক্ত হচ্ছেন, যা গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে।
সব মিলিয়ে মণিরামপুরের কৃষিতে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা এখন শুধু স্থানীয় উন্নয়ন নয়, জাতীয় কৃষি অগ্রগতিরও একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সমন্বিত চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষকেরা নতুন আশা দেখছেন, বাজার পাচ্ছে বৈচিত্র্যময় সবজি, আর দেশের কৃষি খাত খুঁজে পাচ্ছে আরো বেশি টেকসই ও লাভজনক ভবিষ্যৎ।
শেয়ার করুন