বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মহানবীর জীবনাচারে সরলতার সৌন্দর্য

রাসুলুল্লাহ স. এর সব আচরণই সমগ্র মানবতার জন্য আদর্শ। সরল সহজ ও অকৃত্রিম আচরণ ছিল নবী জীবনের শীর্ষ সৌন্দর্য এবং তুলনাহীন আদর্শের প্রতীক। মহান আল্লাহ বলেনঃ
قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ
‘‘বলো, এর বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, আর আমি কৃত্রিমতা অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই।” -৮৬, সাদ

আমার এই লেখায় মহানবীর জীবনাচারে সরলতার সৌন্দর্য ধারণ হয়েছে।

সরলতা, ভদ্রতা ঈমানের অঙ্গ

البذاذة من الإيمان
“সরলতা-সৌজন্য ঈমানের অংশ।” -মুসলিম

অধিকাংশ জান্নাতি হবে সরলতর

أَكْثَرُ أَهْلِ الْجَنَّةِ الْبُلْهَ
“বেহেশতের অধিকাংশ মানুষই হবে সাধারণ সরল।” -মুসলিম

 দুর্বল- নম্ররাই জান্নাতি হবে

أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ؟ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعَّفٍ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ
“আমি কি তোমাদের জান্নাতি মানুষের সংবাদ দেব না? তারা হলো দুর্বল ও নম্র স্বভাবের মানুষ। যদি তারা আল্লাহর নামে কসম খায়, আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন।” -মুসলিম

নবীজী সমাজের দুর্বলদের একজন

ابْغُوني ضُعَفَاءَكُمْ فَإِنَّمَا تُرْزَقُونَ وَتُنْصَرُونَ بِضُعَفَائِكُم
বাংলা অনুবাদ
“তোমাদের দুর্বলদের মাঝেই আমাকে খুঁজো। নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের দুর্বলদের মাধ্যমেই রিযিক প্রাপ্ত এবং সাহায্যপ্রাপ্ত হও।” -বুখারি

মিসকিনদের দলভুক্ত নবীজি

اللهم أحيني مسكينًا وأمتني مسكينًا واحشرني في زمرة المساكين
“হে আল্লাহ! আমাকে মিসকিন (নম্র ও বিনয়ী) অবস্থায় জীবিত রাখুন, মিসকিন অবস্থায় মৃত্যু দিন, এবং মিসকিনদের দলে আমাকে কিয়ামতের দিনে একত্র করুন।” -বুখারী

প্রান্তিক অসহায়ও আল্লাহর কাছে প্রিয়

رُبَّ أَشْعَثَ أَغْبَرَ مَدْفُوعٍ بِالأَبْوَابِ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ
“অনেক এমন লোক আছে, যার চুল এলোমেলো, শরীর ধুলায় মলিন, দরজার কাছে যাকে লোকেরা দূরে ঠেলে দেয়; কিন্তু সে যদি আল্লাহর নামে কসম করে কিছু চায়, আল্লাহ তা অবশ্যই পূর্ণ করেন।” -মুসলিম

কঠিন নয় সহজ পক্ষের তিনি

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا أُعْطِيَ أَمْرَانِ اخْتَارَ أَسْهَلَهُمَا مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ إِثْمٌ وَلَا يَنْتَقِمُ لِنَفْسِهِ وَلَكِنْ لِلَّهِ يَنْتَقِمُ
”হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ স. কে যখনই দু’টি কাজের মধ্যে বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হতো, তিনি সহজটি বেছে নিতেন যদি তাতে কোনো গুনাহ না থাকে। তিনি নিজের জন্য কখনো অন্যায় প্রতিশোধ নিতেন না, তবে আল্লাহর জন্য প্রয়োজন হলে প্রতিশোধ নেয়া হতো।” -বুখারি

কাজ হবে সামর্থ্যের অনুরূপ

فَاكْلَفُوا مِنَ الْعَمَلِ مَا تُطِيقُونَ
“কাজের ক্ষেত্রে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণ করো।” -বুখারি

সহজ,পরিশ্রমী এবং স্বনির্ভর জীবনধরণ

قَالَتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَعْمَلُ بِيَدَيْهِ فِي أَمْرِهِ يَخِيطُ حِذَاءَهُ وَيَلْصِقُ ثِيَابَهُ وَيَعْمَلُ فِي بَيْتِهِ وَيَحْلِبُ الْبَقَرَ وَيُنَظِّفُ ثِيَابَهُ وَأَمْرَهُ نَفْسَهُ
“হযরত আয়েশা রা. বলেন, নবী স. নিজের কাজ নিজে করতেন, জুতা সেলাই করতেন, কাপড়ে তালি লাগাতেন, সংসারের কাজ করতেন, বকরী দোহন করতেন, কাপড় ছাফ করতেন এবং নিজের কাজ নিজে করতেন।” -বুখারি

রাজকীয় নয় আমার জীবনধরণ

إِنِّي لَا آكُلُ مُتَّكِئًا
“আমি হেলান দিয়ে (অহংকারপূর্ণ ভঙ্গিতে) আহার করি না।” -বুখারী

আমি একজন দাস মাত্র

إِنِّي آكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ وَأَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدٌ
“আমি যেমন একজন দাস (ক্রীতদাস) খায়, তেমনই খাই, এবং যেমন দাস বসে, তেমনই বসি, কারণ আমি তো একজন দাস (আল্লাহর বান্দা) মাত্র।” -মুসনাদে আহমাদ

মুসাফাহারত হাত ফিরিয়ে নিতেন না আগে

مَا صَافَحَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ رَجُلًا قَطُّ فَنَزَعَ يَدَهُ مِنْ يَدِهِ حَتَّى يَكُونَ هُوَ الَّذِي يَنْزِعُ يَدَهُ
“রাসূলুল্লাহ স. কখনও কারও সঙ্গে করমর্দন করলে তিনি আগে নিজের হাত টেনে নিতেন না যতক্ষণ না অপরজন টেনে নিত।” -তিরমিজি

মুখ ফিরাতেননা তিনি যতক্ষণ অন্যেরা না ফিরায়

وَلا صُرِفَ وَجْهُهُ عَنْ أَحَدٍ حَتَّى يَكُونَ هُوَ الَّذِي يَصْرِفُ وَجْهَهُ
“তিনি কখনও কারও দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন না যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি নিজেই মুখ ফিরিয়ে নিত।” -তিরমিজি

সঙ্গীর সামনে পা প্রসারিত করেননি কখনও

وَمَا رُئِيَ مُقَدِّمًا رِجْلَيْهِ بَيْنَ يَدَيْ جَلِيسٍ لَهُ.
“তাঁকে কখনও দেখা যায়নি যে তিনি তাঁর সঙ্গীর সামনে নিজের পা প্রসারিত করে রেখেছেন।” -তিরমিজি

 অংশগ্রহণে বিশিষ্ট হতেন না কখনও

وَجَلَسَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ حَيْثُ يَنْتَهِي بِهِ الْمَجْلِس
“নবী করিম স. সেই জায়গায় বসতেন যেখানে সভার শেষ হয়।” -বুখারী

হিজরতের পথে অচেনা প্রিয় নবীজি

মদীনার পথে চলমান হিজরতের কাফেলা। নবীজি স. সামনের সওয়ারীতে, আবু বকর রা. ছিলেন পিছনে। আবু বকর রা. কে মানুষ চিনত কিন্তু নবীজিকে চিনতনা। কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করত আবু বকর, তোমার সামনের লোকটা কে? এর জবাবে আবু বকর রা. বলতেনঃ
هذالرجل يهدينی الطريق
“এই লোকটি আমাকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন।”
এতে প্রশ্নকর্তা সাধারণ পথকেই বুঝে নিত। অথচ আবু বকর রা. সত্য ও ন্যায়ের পথকেই বুঝাতেন। -বুখারী

মদিনায় প্রথমে চেনা যায়নি নবীজিকে

جاء النَّبِيُّ ﷺ وَأَبُو بَكْرٍ وَأَبُو بَكْرٍ كَثِيرُ الشَّعْرِ وَالنَّبِيُّ ﷺ أَشْبَهُ النَّاسِ بِهِ وَمَا عَرَفَهُ النَّاسُ حَتَّى ظَلَّلَ أَبُو بَكْرٍ عَلَيْهِ بِثَوْبٍ فَعَرَفَهُ النَّاسُ
“নবীজী স. এবং আবু বকর রা. একসাথে মদিনায় আসেন। আবু বকর রা. এর চুল ঘন ছিল, আর নবী স. দেখতে তার মতোই ছিল, মানুষ তাঁকে চিনতে পারেনি। ফলে তারা আবু বকর রা.কেই সালাম দিচ্ছিল। কিন্তু যখন সূর্যের আলো নবী স. কে স্পর্শ করতে লাগল, তখন আবু বকর রা. তাঁর কাপড় দিয়ে নবী স. কে ছায়া দিলেন। তখনই মানুষ বুঝল ইনিই আল্লাহর রাসূল স.।” -বুখারি

সবার সাথে নবীজি সাধারণ কর্মী

মদিনার মসজিদ নির্মাণের কাজ চলছে। নবীজি স. কাঁচা ইট তৈরী করার নির্দেশ দিয়ে নিজেও ইট বানাতে শুরু করলেন। সকল আনসার মুহাজির সাহাবীও এ কাজে অংশগ্রহণ করেন। সাহাবায়ে কেরামের সাথে নবীজিও ইট বহন করছিলেন এবং বলছিলেনঃ

هذالحمال لا حمال خيبر * هذا  ابر  ربنا  واطهر
“এ বোঝা খায়বরের খেজুরের বোঝা নয়, এ আমার মহান প্রভুর ঘর নির্মাণের বোঝা, যিনি অতিশয় নেককার ও পবিত্র।”

اللهم ان الاجر اجرالاخرۃ * فارحم الانصار والمهاجرۃ
“হে আল্লাহ, আমরা পারিশ্রমিক হিসেবে কেবল আখেরাতের পারিশ্রমিকই আশা করি। আপনি আনসার এবং মুহাজির সাহাবীদের মেহেরবানী করুন।” -ফাতহুল বারী

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّهُمْ كَانُوا يَحْمِلُونَ اللَّبِنَ لِبِنَاءِ الْمَسْجِدِ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَعَهُمْ قَالَ فَاسْتَقْبَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ عَارِضٌ لَبْنَةً عَلَى بَطْنِهِ فَظَنَنْتُ أَنَّهَا قَدْ شُقَّتْ عَلَيْهِ قُلْتُ نَاوِلْنِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ خُذْ غَيْرَهَا يَا أَبَا هُرَيْرَةَ فَإِنَّهُ لَا عَيْشَ إِلَّا عَيْشُ الْآخِرَةِ
“আবু হুরাইরাহ রা. থেকে বর্ণিত, সাহাবাগণ মসজিদে নববী নির্মাণের জন্য ইট বহন করছিলেন এবং আল্লাহর রাসূল স. নিজেও আমাদের সঙ্গে ইট বহন করছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ স. এর সামনে এলাম, তিনি বুকে একটি ইট তুলে রেখেছিলেন। আমি ধারণা করলাম যে হয়তো এটি তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এটি আমাকে দিন, আমি বহন করি। তিনি বললেন, হে আবু হুরাইরাহ, অন্যটি নাও কারণ প্রকৃত জীবন তো শুধু পরকালের জীবন।” -মুসনাদে আহমাদ

বদরের যুদ্ধে নবীজির বাহন ব্যবহার

বদর যুদ্ধ যাত্রায় মুসলমানদের কাফেলায় বাহনের পরিমাণ ছিল খুবই সীমিত। মাত্র দুইটি ঘোড়া। একটি ছিল যোবায়ের ইবনুল আওয়াম এবং অপরটি মিকদাদ রা. এর। প্রতিটি উট দুই তিনজনের মধ্যে বন্টন করা হয়েছিল।

عن عبد الله بن مسعود قال كانوا يومَ بدرٍ ثلاثةً على بعيرٍ وَكانَ زميلَ رسولِ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ عليُّ بنُ أبي طالبٍ وأبو لُبابةَ فَكانَ إذا كانَ عَقَبتُه قالا اركبْ حتَّى نمشِيَ فيقولَ ما أنتُما بأقوى منِّي وما أنا بأغنى عنِ الأجرِ منكما»
“আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত: “আমরা বদরের দিনে এক উটের ওপর তিনজন সওয়ার ছিলাম।রাসূলুল্লাহ স. এর সঙ্গী ছিলেন  আলী রা. এবং আবু লুবাবা রা.। যখন রাসূলুল্লাহ স. এর হেঁটে চলার পালা আসতো, তখন তারা দুজন বলতেন হে আল্লাহর রাসূল, আপনি সওয়ার থাকুন, আপনার হাঁটার পরিবর্তে আমরা হেঁটে যাই। তখন রাসূলুল্লাহ স. বলতেন, হাঁটার ক্ষেত্রে তোমরা আমার চেয়ে অধিক শক্তিশালী নও আর আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাওয়ার ক্ষেত্রে তোমাদের চেয়ে আমি কম আশাবাদি নই।” -মুসনাদে আহমাদ

পরিবারের সাধারণ কাজের কর্মী

عَنْ الْأَسْوَدِ قَالَ سَأَلْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا مَا كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ؟ قَالَتْ كَانَ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ فَإِذَا سَمِعَ الْأَذَانَ خَرَجَ
“আসওয়াদ রহ. বলেন, আমি আয়েশা রা. কে জিজ্ঞাসা করলাম, নবী করিম স. ঘরে কি করতেন? তিনি বললেন, তিনি পরিবারের কাজকর্মে সাহায্য করতেন আর যখন আজানের শব্দ শুনতেন, তখন নামাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতেন।” -বুখারি

নিজের কাজ নিজে করতেন

كَانَ بَشَرًا مِنَ الْبَشَرِ يَفْلِي ثَوْبَهُ وَيَحْلِبُ شَاتَهُ وَيَخْدُمُ نَفْسَهُ
“তিনি মানুষের মধ্যে এক ছিল, গেঞ্জি আঁচড়াত, তার ভেড়া দুধ দিত, নিজের কাজ করত।”-বুখারি

অতি সাধারণ জীবন মান

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ تَوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَمَا فِي بَيْتِي شَيْءٌ يَأْكُلُهُ ذُو كَبِدٍ إِلَّا شَطْرُ شَعِيرٍ فِي رَفٍّ لِي فَأَكَلْتُ مِنْهُ طَوِيلًا ثُمَّ كِلْتُهُ فَفَنِيَ
“হযরত আয়েশা রা. বলেনঃ রাসুলুল্লাহ স. যখন ইন্তেকাল করেন, তখন আমার ঘরে এমন কিছুই ছিল না যা কোনো প্রাণী খেতে পারে, কেবলমাত্র সামান্য কিছু যব ছিল একটি তাকের উপর। আমি দীর্ঘদিন তা থেকে খেতাম। কিন্তু যখন একদিন আমি তা মেপে রাখলাম, তখন সেটি শেষ হয়ে গেল।” -বুখারি

খেজুর পাতার বিছানায় মহানবী

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ دَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ وَهُوَ نَائِمٌ عَلَى حَصِيرٍ وَقَدْ أَثَّرَ فِي جَنْبِهِ فَبَكَيْتُ فَقَالَ مَا يُبْكِيكَ؟ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ كِسْرَى وَقَيْصَرَ فِيمَا هُمْ فِيهِ مِنَ النَّعِيمِ وَأَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ!
فَقَالَ أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُونَ لَهُمُ الدُّنْيَا وَلَنَا الْآخِرَةُ
“আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন:
আমি একদিন রাসূলুল্লাহ স. এর নিকট গেলাম। দেখি, তিনি খেজুরপাতা বা চটের বিছানায় শুয়ে আছেন, আর তাতে তার শরীরে দাগ পড়ে গেছে। আমি কাঁদতে লাগলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে ইবনু মাসউদ, তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! রোম ও পারস্যের বাদশাহরা কত বিলাসে জীবনযাপন করছে, আর আপনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হয়েও এমন কষ্টে আছেন! তখন রাসূলুল্লাহ স. বললেন, হে ইবনু মাসউদ, তুমি কি সন্তুষ্ট নও যে তাদের জন্য থাকবে দুনিয়া, আর আমাদের জন্য থাকবে আখিরাত?” -বুখারী

ইহুদির ঘরে নবীজির বর্ম বন্ধক

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ ارْتَهَنَ دِرْعَهُ عِنْدَ يَهُودِيٍّ بِالْمَدِينَةِ وَأَخَذَ مِنْهُ شَعِيرًا لِأَهْلِهِ، وَمَاتَ وَدِرْعُهُ عِنْدَ ذَلِكَ الْيَهُودِيِّ
“আনাস ইবনে মালিক রা.থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ স. মদিনার এক ইহুদির কাছে পরিবারের জন্য কিছু যব সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তার বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন। তিনি ইন্তেকাল করেন, অথচ সেই বর্ম তখনও ঐ ইহুদির নিকট বন্ধক অবস্থায় ছিল।” -বুখারি

অথচ অনেক বিত্ত বিভব ডেকেছিল তাকে

অনেক বিত্ত বিভব ডেকেছিল তাকে।
ورَاوَدَتْهُ الجِبَالُ الشُّمُّ مِنْ ذَهَبٍ
عَنْ نَفْسِهِ فَأَرَاهَا أَيَّمَا شَمَمِ
“স্বর্ণে পরিপূর্ণ উচ্চ পর্বতসমূহও যখন তাকে প্রলুব্ধ করেছিল, আমাদেরকে গ্রহণ কর। নবীজি সে আহবান প্রত্যাখ্যান করে দেখালেন কী অপরিসীম আত্মমর্যাদা তাঁর!” -বিখ্যাত আরব কবি আবু ফিরাস আলহামদানি

মর্যাদায় সবার উপরে তিনি

وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
“আর আমি আপনার জন্য আপনার স্মরণকে করেছি সুউচ্চ।” -আল-ইনশিরাহ, ৪

তিনি রাহমাতুল্লিল আলামিন
এরশাদ হয়েছেঃ وما ارسلناك إلا رحمة للعالمين
“আমি তো আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য শুধুমাত্র রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” -আম্বিয়া, ১০৭ ।
আয়াতে عالمين শব্দটি عالم এর বহুবচন। মানব, জ্বীন, জীবজন্তু, উদ্ভিদ, জড়পদার্থ সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর রুবুবিয়াতের সীমানা যতদূরে সুবিস্তৃত, ততদূর এবং সীমানা ব্যাপী তিনি রহমত।

তার জীবন ছিল বরকতের আকর

তিনি যখন দুধমাতা হালিমা আসসাদিয়ার ঘরে।
শিশু নবীজি স. কে মক্কায় গ্রহণ করার পর হালিমার বাড়িতে মাত্র একটি দিন অতিবাহিত হলো। মাত্র একটি দিনে এ শিশুর মাঝে তারা যা দেখলেন, অভিভূত হলেন।ভোর বেলায় হালিমা আসসাদিয়া রা. এর স্বামী বললেনঃ
تعلمي والله يا حليمة لقد أخذت نسمة مباركة
“হালিমা, আল্লাহর শপথ ! তুমি ভালো করে জেনে নাও, তুমি কিন্তু বড়ই বরকতপূর্ণ একটি শিশুকেই গ্রহণ করেছ।”

একদিন আগে শিশু নবীজীকে মক্কায় আসা প্রত্যেক ধাত্রীমাতার সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল, কেউ তাকে গ্রহণ করেনি। কারণ এ শিশুটি ছিল ইয়াতিম। এ শহর ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে হালিমা শূণ্য হাতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে এই ইয়াতিম শিশুটিকেই নেয়ার অদম্য ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। তার স্বামীকে তিনি বলেছিলেনঃ
والله لاَذهبنَّ إلى ذالك اليتيم فلاَخذنَّه قال عليك عسى الله أن يجعل لنا فيه بركة
“আল্লাহর কসম ! আমি এই ইয়াতিম শিশুটির কাছেই যাবো এবং তাকেই গ্রহণ করবো। স্বামী বললেনঃ ঠিক আছে। হতে পারে আল্লাহ তায়ালা এই শিশুটিকেই আমাদের জন্য বরকতের কারণ ও মাধ্যম বানিয়ে দিবেন।” -সীরাতে ইবনে হিশাম, আলখাসায়েসুল কুবরা

সৌভাগ্য তিনি জগতবাসির

বিশ্বনবী স. এর হিজরতের শেষ পর্যায়ে মদিনাবাসীর অপেক্ষার প্রহর অধ্যায়। তারা প্রতিদিন সকাল বেলায় মদিনার বাইরে কংকরময় ভূমিতে গিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করত এবং দুপুরের রোদে ঘরে ফিরত। অবশেষে একদিন মদিনার সবচেয়ে উঁচু স্থান হাররা থেকে রাসুলুল্লাহ স. এবং তার সঙ্গীদেরকে সাদা পোষাক পরিহিত অবস্থায় মরীচিকা ভেদ করে আসতে দেখে একজন ঘোষণা দিলঃ
يا معاشر العرب هذا جدكم الذى تنتظرون
“হে আরববাসী ! যে সৌভাগ্যের জন্য তোমরা প্রতীক্ষা করেছিলে, এই সেই সৌভাগ্য। -বুখারি

অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল নবীজিকে

নবীজি স. এর মোহরে নবুয়তের বাইরের দিকে লেখা ছিলঃ
تَوَجَّهْ حَيْثُ شِئْتَ فَإِنَّكَ المَنْصُورٌ
“হে নবী, ইচ্ছা যেদিকে সেদিকে দৃষ্টি দিন, সকল অবস্থায় সাহায্যপ্রাপ্ত আপনি।”
(আল্লাহ আপনার সাথে আছেন, আপনি নির্ভয়ে পদক্ষেপ নিন।) -আবু নুয়াইম, রাবি সালমান রা.

( লেখক,

প্রভাষক মাওলানা রেজাউল করিম নওগাঁ
আরবি প্রভাষক, ধর্মপুর গোয়ালভিটা হোসেনিয়া আলিম মাদ্রাসা বদলগাছি, নওগাঁ। )

শেয়ার করুন