সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চোখে অজানা শব্দ, অন্তরে নিঃশব্দ কান্না

সুখ, দুঃখ, মায়া, মমতা, দায়িত্ব, অবহেলা, কষ্ট, সংগ্রাম, ডিপ্রেশন, হৃদয়ের লোকানো কথা, না পাওয়ার যন্ত্রনা, স্বপ্নভাঙ্গা, হৃদয় ভাঙ্গা, স্বপ্নগড়া… পরিবারের মুখে হাসি ফুটানো, আত্মীয়দের কাছে ভালো থাকা, বেকারত্ব নিয়ে সমাজের মুখোশধারী কথাবার্তা নিজে নিজে বহন করা কত যে কষ্ট তা শুধু সে ছেলেটাই জানে যে এগুলো মোকাবিলা করে।

গভীর রাতে নীরবে, নিজের অজান্তে বুকচিরে অশ্রুজলে বুক ভিজে যাওয়ার যে কষ্ট তা পৃথিবীর কেউ দেখে না, বুঝে না। আর এই চোখের জল ফেলার ইতিহাস কখনো কাউকে বলা যায় না; কখনো কখনো খেতে বসে চোখে জল নেমে আসে, কেউ দেখে না।

নিজে ভালো না থাকলেও কাছের মানুষদের সুখে রাখার চেষ্টা যে কত কষ্টের তা কেউ জানে না। এসবের আক্ষেপ যে একটা ছেলেকে কতটা ভেঙ্গে ফেলে তা শুধু সে ছেলেটাই জানে। ভালোবাসা চেয়ে ভালোবাসা না পাওয়া, আত্মীয়দের কালো চোখে তাকানো, তাদের যে চাহিদা—সেই ছেলেটাকে ভিতর থেকে মেরে ফেলে, তা কেউ দেখেনা। একটা সময় সে জীবন্ত লাশ হয়ে যায়, পৃথিবী তার জন্য নির্মম হয়ে যায়।

একটা সময় সে ছেলেটা যখন সব কিছু মেনে নিয়ে হতাশা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা হৃদয়ের এক কোনে রেখে, দুঃখের চাদরে সব কিছু ঢেকে, যখন পৃথিবীকে নতুন করে জানতে চায়, জীবনের সাথে সংগ্রাম করে, যখন সব যুদ্ধে জয়ী হওয়ার খেলায় মাতে, ঠিক তখনই অজানা ঝড় এসে সেই ছেলেটার বেঁচে থাকার সব অবলম্বন কেটে নিয়ে যায়।

যখন ছেলেটি পরিবারে থাকা দুজন মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁচতে চায়, খুব ছোট বেলায় পিতা হারানোর যন্ত্রণা ভুলে নিজের প্রতি বড় ভাইয়ের দায়িত্বের অবহেলা দেখে, এমনকি একটা সময় যখন স্বার্থের টানে একটু আরামের জীবনের খুঁজ পায়, তখন ছোট ভাই, মা, পরিবার রেখে চলে যায়। তখন সেই ছোট ভাই পৃথিবীর নির্মমতা না বুঝলেও একটা সময় ধীরে ধীরে সব বুঝতে পারে। গভীর ভাবনায় ভাবিত হয়ে, চাঁদের আলোয় যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে সব অতীত মনে করে, সবকিছুর সম্পর্কে ধারনা নিতে গিয়ে, তখন দেখে—এই জীবন শুধু কষ্টের নাম।

সবার কাছ থেকে পাওয়া কষ্ট ভুলে যখন নিঃস্বার্থে ভালোবাসতে যায়, তখনই স্বার্থের কাছে বন্দী হয়ে যাওয়া সেই আপন মানুষগুলো দূরে থাকে। হৃদয়ে কষ্ট জমতে জমতে হৃদয় দুর্বল হয়ে হার্ট অ্যাটাকের খুব কাছে চলে যায়, সেই মানুষটি হারিয়ে যায়, জীবনের সব আশা আকাঙ্খা সঙ্গে নিয়ে।

যা একটা মানুষকে নতুন করে বাঁচার কোন দিক দেখাতে পারে না। সব শেষে ধীরে ধীরে সেই মানুষটি নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে এক অজানায় হারিয়ে যায়, যা কখনো সে ভাবেনি। জীবন তাকে সেই অনাকাঙ্খিত জায়গায় নিয়ে যায়।

হয়তো সে কখনো আবার মৃত্যুর সিদ্ধান্ত বেছে নেয়; সৌভাগ্যবশত ইসলাম ধর্মের মানুষ হওয়ায় পরকালের চিন্তায় সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। আবার কখনো কেউ কেউ সেই সিদ্ধান্তের মধ্যে অটুট থেকে পৃথিবীর এই নিষ্ঠুর খেলাকে না বলে হারিয়ে যায় মাটির বিছানায়।

বেঁচে থাকতে কেউ কখনো অবহেলা ছাড়া ভালোবাসি বলেনা, কিন্তু নিজের কষ্ট লুকানোর জন্য যখন নিজের কাছের মানুষদের কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে চলে যায়, ঠিক তখনও সে ভাবে—এইভাবে তাদেরকে একা রেখে চলে গেলে আমার মত তাদের কে দেখে রাখবে কে?

নিজে কষ্ট পেতে পেতে, মনের সাথে যুদ্ধ করে, বুকে ব্যাথা নিয়ে, নিজের শরীরে অনেক রোগ থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা না করে ভোগে ভোগে সেই রোগটাকে লুকিয়ে রাখে। একটা সময় সেই রোগটাই হয়ে দাঁড়ায় তার মৃত্যুর কারণ, অথচ কেউ জানে না এই রোগের বয়স কত।

এই রোগের কথা কাউকে কখনো বলা যায় না,,বললে মা কখনো বলবে না—“আমার গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ নেই”, নানী কখনো বলবে না—“আমি ঠিকমতো দাঁড়াতে পারি না, একটি ইনজেকশন নিতে হবে”। তাদের এই ছোট ছোট চাওয়াই ছেলেটাকে চিন্তার মাঝে ফেলে দেয়। আবার যখন সে ভাবে—“আমার সবকিছুই তাদের জন্য, বাঁচা-মরা সবই তাদের জন্য”, ঠিক তখনই ছেলেটা বাঁচার জন্য নতুন অনুপ্রেরণা পায়। সব কষ্ট ভুলে নতুন করে বাঁচতে চায়।

বিদাতার কাছে প্রার্থনা করে, নিজের আগে যেন তাদের কারো মৃত্যু না হয়। দুনিয়ার সব কষ্ট সহ্য করতে পারবে, কিন্তু তাদের মৃত্যু চোখের সামনে সহ্য করতে পারবে না।

ছেলেটার যখন হাতে ছোট টিউমার থাকে, দাঁতে সমস্যা থাকে, হার্ট দুর্বল হয়ে বুকে ব্যাথা থাকে, তা কখনো কাউকে বলা যায় না। বন্ধুরা কিছুটা শান্ত্বনা দিয়ে চলে যায় আর সঙ্গী হয় রাতের নীরবতা। নীরবতায় যখন দাঁতে ব্যাথা উঠে, চিৎকারের শব্দ হয়, তখনই মনে পড়ে—চিকিৎসার টাকা নিজের পকেটে নেই। যা আছে, তা নিজের পিছনে খরচ করলে পরিবার কষ্ট পাবে।

কারণ ছেলেটা জানে—যদি বলে সে অসুস্থ, মা কখনোই বলবে না—আজকে ঘরে বাজার নেই, ঔষধ নেই। কারণ তিনি মা। নানী কখনোই বলবে না—“আমার এটা নেই, সেটা নেই।” কারণ তিনি ছেলেটাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

জীবন কাটাতে কাটাতে যখন একটা সময় আসে, হয়তো মা, নয়তো নানী দুনিয়াকে বিদায় জানায়। দেখতে পারে না সন্তানের সুখ, স্বপ্ন পূরণ। তখন সে কষ্ট নিয়ে চলে যায় ঠিকই, দিয়ে যায় ছেলেটার বুকে চাপা কষ্ট। ছেলেটা চিৎকার করতে পারে না, কাঁদতে পারে না, চুপ করে থাকে।

পরিবারে যখন একজনকে দেখাশোনার জন্য বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই মনে পড়ে—সমস্ত দুঃখের মাঝেও যার হাসি দেখলে সব ভুলে গিয়ে সুখ খুঁজে নিতো, তার কথা। কিন্তু সে আজ আর নেই। আছে, তবে তার নেই। অন্যের ঘরনিও হয়নি। তাহলে তাকে পেতে বাধা কোথায়? বাধা হচ্ছে—ছেলেটার পৃথিবীতে কিছু বলার নেই। মেয়েটাও কখনো ছেলেটাকে ভালোবাসে নাই। ছেলেটার কি আছে না আছে, কখনোই কোন কিছু জানতে চায়নি, শুধুই ব্যবহার করেছে।

আর যখন ছেলেটা তার চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ, ঠিক তখনই মেয়েটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, আর ছেলেটাও বাস্তবতা মেনে দূরে থাকে। নতুন জীবনের দিকে ছেলেটা অগ্রসর হলে, তখনই স্বৃতিরা হাতছানি দেয়, হৃদয় ভেঙে যায়। এভাবেই সব কিছু মেনে নিয়ে জীবনের সবকিছু হারিয়ে, একদিন সে নিজেই হারিয়ে যায়।

হারানোর পর কিছু স্বার্থপর বন্ধু বলে—তার বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ বিক্রি করে সে তার পরিবার ও ভালোবাসার মানুষকে রানী বানানোর স্বপ্নে মেতে উঠে, একদিন আরামের ঘুম ঘুমানোর ইচ্ছে হৃদয়ে পুষে,কিন্তু সব টাকা কিছু নোংরা মানুষের কালো থাবার মাঝে শেষ করে, নিঃস্ব হয়ে যায়।

আর আমরা কখনোই তার মন বুঝতে পারিনি। ক্ষমা করে দাও, বন্ধু, তোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আজকে তোর এই ডায়েরি না পড়লে হয়তো তোর জীবন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারতাম না। ভালো থাকিস বন্ধু।

পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের ভীড়ে এভাবেই কিছু ছেলে হারিয়ে যায়—নীরবে, নীভৃতে, অজান্তে।

শেয়ার করুন