রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নতুন সাজে দরিয়ানগর উদ্যান : দর্শণার্থীদের আকর্ষণে চলছে দৃষ্টিনন্দন সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ

মোহাম্মদ নোমান, কক্সবাজার প্রতিনিধি :

যেখানে পাহাড় মিশেছে নীল দরিয়ার বুকে,হাওয়ায় ভেসে আসে নোনাজলের সুবাস। ঢেউয়ের ছন্দে বয়ে চলে প্রকৃতি সেইখানেই জেগে উঠছে নতুন এক দরিয়ানগর।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের এই কক্সবাজার বাংলার গর্ব, পর্যটনের প্রাণ। প্রতিদিন ভোরের সূর্য ওঠে এখানে অন্য রকম আলোয়, আর তার সোনালি রশ্মি ছুঁয়ে যায় পাহাড়, বন আর নীল সমুদ্রকে। সেই অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝেই শহর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দক্ষিণে, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাশে গড়ে উঠেছে দরিয়ানগর প্রকৃতি ও পর্যটন উদ্যান যা এখন নবজাগরণের আলোয় ঝলমল করছে।

মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে এগোলে চোখে পড়ে এক বিশাল তিমি মাছের আকৃতির গেইট। সেটিই এই উদ্যানের প্রবেশদ্বার যেন প্রকৃতির বুকের দরজা খুলে দিয়েছে দর্শণার্থীদের জন্য। মাত্র ২০ টাকার টিকিট কেটে গেইট পেরোলেই চোখে পড়বে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য: পাহাড়, গাছ, দোলনা, ফুল আর বাতাসে লবণাক্ত সাগরের সুবাস।

উঁচুনিচু পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখা মেলে এক রহস্যময় গুহা—‘শাহেনশাহ গুহা’। প্রায় আধ কিলোমিটার লম্বা এই প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ পথ যেন এক গোপন রাজ্যের দোরগোড়া। ভেতরে ঢুকলেই শোনা যায় পানির টুপটাপ শব্দ, আর বাইরে থেকে ভেসে আসে ঢেউয়ের ছন্দ।

দরিয়ানগরের প্রধান আকর্ষণ ১০০ ফুট উঁচু পাহাড়চূড়া। আগে এখানে ওঠা ছিল কষ্টসাধ্য; এখন নতুন করে তৈরি হচ্ছে আধুনিক টাইলসের সিঁড়ি ও নিরাপদ রেলিং। পাহাড়ের চূড়ায় তৈরি হচ্ছে গোলাকার ইটের দ্বিতল টাওয়ার, যেখানে বসে দেখা যাবে বঙ্গোপসাগরের নীল জলের অনন্ত বিস্তার।

পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে মনে হবে আমি যেন সাগরের বুকে দাঁড়িয়ে আছি,ঢেউ আসছে, বাতাস বইছে, আর প্রকৃতি ফিসফিস করে বলছে দেখো, আমি এখনো বেঁচে আছি!দূরে দেখা যায় মাছ ধরার ট্রলারের সারি, সূর্যের আলোয় ঝিকিমিকি করছে জলরাশি। এই দৃশ্য একবার
দেখলে ভুলে যাওয়া অসম্ভব।

পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে বাংলো, কটেজ ও বিশ্রামাগার। পরিবার নিয়ে রাত কাটাতে চাইলে প্রাকৃতিক পরিবেশে তৈরি ১২টি কুঁড়েঘর পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত। বাংলোর সামনে রয়েছে ‘সানসেট ভিউ পার্ক’, যেখান থেকে দেখা যায় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সূর্যাস্ত।

সন্ধ্যায় যখন সূর্যের রঙ লাল হয়ে নেমে আসে সাগরের বুকে, তখন বাতাসে মিশে যায় ঢেউয়ের শব্দ, পাহাড়ে বাজে পাখির ডাক, আর মনে হয় প্রকৃতি যেন তার তুলির আঁচড়ে এক জীবন্ত ক্যানভাস এঁকে ফেলেছে।

উদ্যানের নিচে রয়েছে একটি রেস্তোরাঁ, যেখানে পরিবেশন করা হয় কক্সবাজারের বিখ্যাত সামুদ্রিক খাবার—তাজা মাছ, কাঁকড়া, ঝিনুক, জেলিফিশের পদ। প্রাকৃতিক ছাউনির নিচে বসে খাওয়ার অভিজ্ঞতা যেন কবিতার স্বাদে মিশে থাকা এক বাস্তব রূপকথা।

উদ্যানের দায়িত্বে থাকা বিট কর্মকর্তা ক্যাছিংউ মারমা বলেন,দরিয়ানগরকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে আমরা সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ করছি। পাহাড়চূড়ার পথে নতুন টাইলস বসানো, নিরাপদ রেলিং, আলো ব্যবস্থা, বিশ্রামাগার ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে পুরোদমে। শীত মৌসুমের আগে সব শেষ হলে দরিয়ানগর হবে দেশের অন্যতম সুন্দর প্রকৃতি উদ্যান।

এছাড়া উদ্যানে স্থাপন করা হচ্ছে সোলার লাইট,কাঠের বেঞ্চ, সিসিটিভি ক্যামেরা ও নতুন গাইড ম্যাপ। বন বিভাগ বলছে, এখানকার পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়েও তারা সতর্ক।

স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন,আগে দরিয়ানগরে পর্যটক কম আসতো। এখন প্রতিদিন শত শত মানুষ আসছে। এতে এলাকার দোকান, হোটেল ও রিকশাচালকদের ব্যবসাও বাড়ছে। সরকার যদি আরও উন্নয়ন করে, তবে এটি হবে কক্সবাজারের নতুন ‘সিগনেচার স্পট’।

ট্যুর অপারেটরদের মতে, দরিয়ানগর যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে এটি দেশের সেরা ইকো-ট্যুরিজম স্পট হতে পারে। এখানে একইসঙ্গে পাওয়া যাবে পাহাড়, গুহা, বন, জল আর সমুদ্রের মেলবন্ধন যা বিশ্বের খুব কম জায়গায় দেখা যায়।

কক্সবাজারের প্রাচীন নাম ছিল ‘পালং’, পরে ব্রিটিশ অফিসার ক্যাপ্টেন কক্সের নামানুসারে নাম হয় “কক্সবাজার”। সেই সময় থেকেই এটি ছিল প্রাকৃতিক নিসর্গের এক প্রতীক। আজ সেই ধারাবাহিকতায় দরিয়ানগর উদ্যান যেন পুরনো কক্সবাজারের প্রকৃতি ফিরে পাওয়ার আরেক প্রচেষ্টা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যানে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে এটি শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং বাংলাদেশের প্রকৃতি নির্ভর পর্যটনের নতুন প্রতীক হয়ে উঠবে।যেখানে পাহাড়ের চূড়ায় দোলা দেয় সমুদ্রের বাতাস,যেখানে গুহা ফিসফিসিয়ে বলে প্রকৃতির গল্প,সেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ ভুলে যায় শহরের ক্লান্তি।

দরিয়ানগর উদ্যান আজ শুধুমাত্র একটি ভ্রমণস্থল নয় এটি এক অনুভব, এক আবেশ।এখানে প্রকৃতি কথা বলে, ঢেউ গেয়ে ওঠে গান, আর মানুষ ফিরে পায় নিজের অস্তিত্বের শিকড়।বাংলার দক্ষিণ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই দরিয়ানগর উদ্যান যেন ঘোষণা দিচ্ছে প্রকৃতি এখনো সুন্দর, যদি আমরা তাকে ভালোবাসি।

শেয়ার করুন