বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঐতিহ্য হারাচ্ছে জকিগঞ্জের শীতকালীন চুঙ্গাপিঠা: দুষ্প্রাপ্য ঢলু বাঁশ ও বিন্নি চাল ​

আব্দুস শহীদ শাকির, জকিগঞ্জ প্রতিনিধি :
আধুনিকতা ও উপকরণের অভাবে আজ বিলুপ্তির পথে সিলেটের জকিগঞ্জ অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘চুঙ্গাপুড়া পিঠা’ বা ‘চুঙ্গাপিঠা’। একসময় অগ্রহায়ণ মাসের শেষ থেকে শীতের শেষ পর্যন্ত গ্রামের ঘরে ঘরে যে পিঠা তৈরির ধুম পড়তো, সেই চুঙ্গাপুড়া এখন কেবলই স্মৃতি। এই পিঠার প্রধান উপকরণ ‘ঢলু বাঁশ’ এবং ‘বিন্নি ধানের চাল’ (বিরইন চাল) সহজলভ্য না হওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে সুস্বাদু এই শীতকালীন ঐতিহ্য।
​চুঙ্গাপিঠা কেবল একটি খাবার নয়, এটি সিলেটের একটি নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়।পিঠা তৈরির মূল উপাদান হলো বিশেষ ধরনের ঢলু বাঁশ ও বিন্নি/বিরইন ধানের চাল। এছাড়া স্বাদ বাড়াতে দুধ, চিনি, নারকেল ও চালের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়।
​ঢলু বাঁশের একটি ছোট খন্ড বা ‘চুঙ্গা’-এর ভেতরে কলাগাছের পাতা দিয়ে মুড়িয়ে বিন্নি চালের মিশ্রণ ভরে দেওয়া হয়। এরপর এই চুঙ্গাগুলো খড় (নেরা বা খের) দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় আগুনে পোড়ানো হয়।ঢলু বাঁশে প্রাকৃতিক তৈলাক্ত রাসায়নিক পদার্থ এবং অত্যধিক রস থাকায় তা সহজে পুড়ে না গিয়ে কেবল আগুনের তাপে ভিতরের পিঠাটিকে সেদ্ধ করে তোলে। সম্পূর্ণ সেদ্ধ হওয়ার পর বাঁশটি থেকে পিঠাটি মোমবাতির মতো আলাদা হয়ে বেরিয়ে আসে।
​একসময় শীতের রাতে চুঙ্গাপুড়া আর মাছ ভাজার (স্থানীয় ভাষায় ‘মাছ বিরান’) আয়োজন ছিল সিলেট অঞ্চলে মেহমান আপ্যায়ন, বিশেষ করে নতুন জামাইকে পরিবেশনের অন্যতম রেওয়াজ। কিন্তু বর্তমানে এই চিত্র বদলে গেছে।
ঐতিহ্যবাহী এই পিঠা হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো: চুঙ্গাপিঠার অপরিহার্য উপকরণ ঢলু বাঁশ এখন প্রায় বিলুপ্ত। বনাঞ্চল উজাড় এবং পাহাড়খেকোদের কারণে মৌলভীবাজার ও সিলেটের টিলা অঞ্চল থেকে এই বাঁশ হারিয়ে গেছে।বর্তমানে ঢলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল বাজারে খুব কম পাওয়া যায় এবং এর দামও বেশ চড়া।আধুনিক জীবনে দ্রুত তৈরি খাবারের চাহিদা বাড়ায় চুঙ্গাপিঠার মতো শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকে।
​স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমী ও প্রবীণরা মনে করেন, এই ঐতিহ্যবাহী পিঠাকে টিকিয়ে রাখতে হলে ঢলু বাঁশ ও বিন্নি চালের চাষাবাদে সরকারি প্রণোদনা এবং এই পিঠা তৈরির সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ঐতিহ্যবাহী এই খাবারটি যেন কেবল স্মৃতি না হয়ে থাকে, সেজন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা আজ সময়ের দাবি।
শেয়ার করুন