জলিলুর রহমান জনি, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
সিরাজগঞ্জের তাড়াশে শীত এলেই বাড়তে থাকে মুখরোচক কুমড়ো বড়ির চাহিদা। ভোজনরসিকদের কাছে এটি একটি প্রিয় উপাদান, আর স্থানীয় অনেক পরিবারের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। বিশেষ করে তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রামে হাতের তৈরি কুমড়ো বড়ি স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সকালে সরজমিনে নওগাঁ গ্রামের উঠানজুড়ে দেখা মিলেছে ব্যস্ততার। ১৫ থেকে ২০টি পরিবার শীতের সকালকে কাজে লাগিয়ে বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত। কেউ মণ্ড তৈরি করছেন, কেউ আবার বাঁশের কাঠির তৈরি নেটের ওপর বিশেষ পদ্ধতিতে বড়ি সাজাচ্ছেন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন মণ্ড তৈরির কাজ যন্ত্রে হলেও বড়ি রোদে শুকানো থেকে চূড়ান্ত প্রস্তুত—সবই হাতে করা হয়। এ কাজে একদিকে যেমন নারীরা আত্মনির্ভরশীল হচ্ছেন, অন্যদিকে পুরোনো ঐতিহ্যও টিকে আছে অটুটভাবে।
শীতে কুমড়ো বড়ির স্বাদ অতুলনীয়—এমনটাই বললেন স্থানীয় নারীরা। চাল, কুমড়ো ও মাষকলাই ডালের মিশ্রণে তৈরি বড়ি গ্রামের প্রতিটি উঠানেই যেন একটি ছোট কারখানার আবহ তৈরি করে। এ শিল্পটি শুধু মৌসুমি হলেও এর লাভে কয়েকশ পরিবার বছরের ব্যয় নির্বাহ করেন।
বাজারজাতকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর সাধারণ মানের কুমড়ো বড়ি প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ভালো মানের কুমড়ো দিয়ে তৈরি বড়ির দাম ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। দেশ-বিদেশে থাকা স্বজনদের কাছেও অনেকেই কুমড়ো বড়ি পাঠান উপহার হিসেবে।
স্থানীয় নারীদের মধ্যে মরিয়ম, কানিজ, রুপালি, রজনী, নীলুফা, জরিনা, পায়েল —এভাবে শতাধিক নারী প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বাংলা সনের কার্তিক থেকে ফাল্গুন—এই পাঁচ মাস বড়ি বিক্রির মৌসুম। তাই অক্টোবর থেকেই বড়ি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, আর চলবে আগামী মার্চ পর্যন্ত।
উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়ে বড়ি প্রস্তুতকারীরা জানান, গত বছর মাষকলাই ডাল কেজিপ্রতি ১৩০ টাকা ছিল, এ বছর ১৪০–১৪৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। খরচ বাড়লেও বড়ির জনপ্রিয়তা কিন্তু কমেনি।
নওগাঁ গ্রামের বড়ি প্রস্তুতকারী নাজমা খাতুন জানান, “আগে কুমড়ো বড়ি তৈরি করতে খুব কষ্ট হতো। এখন মেশিন দিয়ে ডাল গুঁড়ো করি, শুধু হাতেই বড়ি বানিয়ে রোদে শুকাই। আমার বাপ–দাদারা বড়ি বানাত, আমরাও বানাই, এখন আমার ছেলেমেয়েরা করছে—এটা আমাদের বংশপরম্পরা।”
তিনি মনে করেন, সরকারি সহায়তা ও ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা বাড়ানো গেলে বড় পরিসরে কুমড়ো বড়ি উৎপাদন করে রপ্তানি করাও সম্ভব।
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ টি এম গোলাম মাহবুব বলেন, “কুমড়ো বড়ি তৈরিতে তাড়াশের শত নারীর জীবিকা সচল রয়েছে। আমরা প্রশিক্ষণ ও ঋণের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা বিস্তারে সহযোগিতা করি।”
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, সংস্কৃতির ঐতিহ্য, নারীর স্বনির্ভরতা—সবকিছু মিলিয়ে তাড়াশের কুমড়ো বড়ি এখন শুধু খাবার নয়, বরং একটি সফল গ্রামীণ শিল্পের প্রতিচ্ছবি। শীতকাল যত এগোবে, নওগাঁ গ্রামের উঠানজুড়ে বড়ি সাজানোর ব্যস্ততাও আরও বাড়বে—সঙ্গে বাড়বে সুদূরের বাজারেও এর কদর।





