বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শবে বরাতের ইবাদত নিয়ে হাদিসের নির্দেশনা

শবে বরাতের ইবাদত নিয়ে হাদিসের নির্দেশনা

ইসলামের ইবাদতব্যবস্থায় সময় ও আমলের গুরুত্ব অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ। কোনো রাত বা দিনের মর্যাদা নির্ধারিত হয় কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে। আরবি বছরের অষ্টম মাস শাবান—যার মধ্যভাগের রাত, অর্থাৎ ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে বলা হয় লাইলাতুম মিন নিসফে শাবান। আমাদের সমাজে এটি ‘শবে বরাত’ নামে অধিক পরিচিত। এই রাতকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম সমাজে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতপার্থক্য চলে আসছে। কেউ কেউ এ রাতের ইবাদতকে বিদআত বলে একেবারে অস্বীকার করেন, আবার কেউ কেউ রাতভর নির্দিষ্ট আমলে লিপ্ত হওয়াকে অপরিহার্য মনে করেন। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সুন্নাহ আমাদের শিক্ষা দেয়—বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি নয়, বরং মধ্যমপন্থাই ইসলামের সৌন্দর্য।

লাইলাতুম মিন নিসফে শাবান: হাদিসের আলোকে মর্যাদা

লাইলাতুল বরাত নামে পরিচিত এ রাতকে ঘিরে মতপার্থক্য থাকলেও মধ্য শাবানের রাতের ফজিলত ও আল্লাহর রহমত অবতরণের বিষয়ে একাধিক হাদিসে বর্ণনা পাওয়া যায়। যদিও এসব হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

১️. অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি

عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ يَطَّلِعُ اللَّهُ إِلَى جَمِيعِ خَلْقِهِ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে তাঁর সমস্ত সৃষ্টির প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে হিব্বান ৫৬৬৫)

২️. রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর জান্নাতুল বাকিতে গমন

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِنَّ جِبْرِيلَ أَتَانِي فَقَالَ: هَذِهِ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَإِنَّ اللَّهَ يُعْتِقُ فِيهَا مِنَ النَّارِ أَقْوَامًا…

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জিবরিল আমার কাছে এসে বললেন—এটি মধ্য শাবানের রাত। আল্লাহ এ রাতে বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন…।’ (তিরমিজি ৭৩৯)

৩️. রাতে নামাজ ও দিনে রোজার নির্দেশ সংক্রান্ত হাদিস

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا نَهَارَهَا…

হজরত আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন মধ্য শাবানের রাত আসে, তখন তোমরা রাতে ইবাদত করো এবং দিনে রোজা রাখো…।’ (ইবনে মাজাহ ১৩৮৮)

৪️. জান্নাতুল বাকিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর উপস্থিতির বর্ণনা

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: فَقَدْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَيْلَةً فَخَرَجْتُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ فَقَالَ ‏”‏ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হারিয়ে ফেললাম (বিছানায় পেলাম না)। আমি (তার সন্ধানে) বের হলাম। এসে দেখলাম তিনি বাকী কবরস্থানে আছেন। তিনি বলেনঃ তুমি কি ভয় করছ আল্লাহ ও তার রাসূল তোমার প্রতি কোন অবিচার করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি অনুমান করলাম আপনি আপনার অন্য কোন বিবির নিকটে গিয়েছেন। তিনি বললেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা মধ্য শা’বানে (১৫ তারিখের রাতে) দুনিয়ার কাছের আকাশে অবতীর্ণ হন। তারপর কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের চেয়েও বেশী সংখ্যক লোককে তিনি মাফ করে দেন।’ (তিরমিজি ৭৩৯, মুসনাদে আহমদ ২৬০১৮)

মূল কথা ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

লাইলাতুম মিন নিসফে শাবানের ইবাদত এমন কোনো ইবাদত নয়—

> যা করতেই হবে

> বা করা একেবারেই নিষিদ্ধ

বরং—

> কেউ একান্তে নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির বা দোয়া করলে তাতে বাধা নেই

> আবার কেউ না করলেও তাকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই

> নির্দিষ্ট রীতি, আতশবাজি, হালুয়া-রুটির আনুষ্ঠানিকতা ইসলামের শিক্ষা নয়

মধ্য শাবানের রাত নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো—ইবাদতের দরজা খোলা, কিন্তু জোরজবরদস্তি নয়। এ রাতকে কেন্দ্র করে বাড়াবাড়ি যেমন অনুচিত, তেমনি অবহেলা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাও কাম্য নয়। আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য প্রতিটি রাতই মূল্যবান। তাই লাইলাতুম মিন নিসফে শাবান হোক আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা প্রার্থনা ও বিদ্বেষমুক্ত হৃদয় গড়ার এক অতিরিক্ত সুযোগ—এর বেশি নয়, এর কমও নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ আমলের তাওফিক দিন। আমিন।

শেয়ার করুন