নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
যাত্রাবাড়ি এলাকা ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত অঞ্চল। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী যাতায়াত করেন এখানে, কিন্তু জরাজীর্ণ, ফিটনেসবিহীন লোকাল বাসের সীমাহীন ভোগান্তি তাদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। অফিসগামী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী—সকলেরই প্রতিদিনের যাত্রীভোগ। বাসগুলো দেখতে অনেকটা পরিত্যক্ত কনটেইনারের মতো, দরজা-জানালা ভাঙা, সিট ছেঁড়া, আর ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া ধোঁয়া পরিবেশ দূষণও করছে। এই মৃত্যুফাঁদেই জীবন নিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।

বেশিরবাগ লোকাল বাসের ই এই অবস্থা , আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করে যাত্রীরা
সকাল কিংবা সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ির প্রধান সড়কগুলোতে দাঁড়ালেই দেখা যায় এক করুণ চিত্র। যাত্রীর তুলনায় বাসের সংখ্যা অপ্রতুল, আর যেগুলো আছে, তার অধিকাংশই লক্কড়-ঝক্কড়। সামান্য বৃষ্টিতেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, সিটে বসলে স্প্রিং বেরিয়ে শরীরে বিঁধে যায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (BRTA) নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় পর বাণিজ্যিক যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, যাত্রাবাড়ি এলাকা দিয়ে চলাচলকারী অনেক বাসই বছরের পর বছর কোনো পরীক্ষা ছাড়াই রাস্তায় চলছে। অসাধু চক্রের যোগসাজশে ফিটনেস সার্টিফিকেট ম্যানেজ করা হয় বলে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যেই কানাঘুষা আছে।
যাত্রাবাড়ি থেকে কমলাপুর, গাবতলী কিংবা যাত্রাবাড়ি থেকে তেজগাঁও রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর চালকদের বেপরোয়া মনোভাব ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। এক বাস আরেক বাসকে ওভারটেক করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ফলে প্রায়শই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে। যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলেন। বাস থামার আগেই যাত্রী নামানো বা ওঠানোর ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক।

বাস ও হকারদের দখলে যাত্রবাড়ি চৌরাস্তা
নারীদের জন্য যাত্রাবাড়ির বাসে যাতায়াত এক বিভীষিকা। সিট না পাওয়া, ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এবং হেলপারদের খারাপ আচরণ—এগুলো প্রায় নিয়মিত ঘটনা। পুরনো বাস থেকে বের হওয়া কালো ধোঁয়া এলাকায় বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
যাত্রাবাড়ি এলাকা দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী শফিকুর রহমান বলেন, “প্রতিদিন দুই ঘণ্টা বাসে ঝুলে অফিসে যাই। এই বাসগুলো চলন্ত ডাস্টবিনের মতো। সরকার নতুন নতুন ফ্লাইওভার বানাচ্ছে, কিন্তু গণপরিবহনের মান উন্নত হচ্ছে না কেন?”
সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও এর প্রয়োগ খুবই কম। ট্রাফিক পুলিশ বা বিআরটিএ-কে মাঝে মাঝে অভিযান চালাতে দেখা গেলেও তা নিয়মিত নয়। ফলে বাস মালিকরা আইনকে তোয়াক্কা করেন না।
যাত্রাবাড়ির গণপরিবহন ব্যবস্থার এই বেহাল দশা এলাকার জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং বাস মালিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা, এই জরাজীর্ণ বাসগুলো অদূর ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।





